গরমে ঘেমে বাড়ি ফিরেই এসির সামনে দাঁড়ানো বা এক গ্লাস বরফ জল খাওয়া আমাদের অভ্যাস। কিন্তু এই অভ্যাসই ডেকে আনতে পারে মারাত্মক "থার্মাল শক"। শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ ওঠানামা করলে রক্তনালী সংকুচিত হয়ে BP বেড়ে যায়, মাথা ঘোরা, বমি এমনকি হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে।
আমরা সবাই গরমে হাঁসফাঁস করি। রোদ থেকে ঘেমে বাড়ি ফিরেই প্রথম কাজ এসি চালানো আর ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জলের বোতল বের করা। ২ মিনিটে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু ভিতরে ভিতরে শরীরের উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে যায়। ডাক্তাররা একে বলে "থার্মাল শক"। নামটা শুনে ছোট মনে হলেও এর ফল হতে পারে প্রাণঘাতী। নিচে সহজ ভাষায় জানুন থার্মাল শক কী, কেন হয় আর কীভাবে বাঁচবেন।

থার্মাল শক আসলে কী এবং কেন হয়
আমাদের শরীর সবসময় 36-37°C তাপমাত্রা ধরে রাখতে চায়। রোদে ঘুরে যখন শরীর 39-40°C হয়ে যায়, তখন রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়ে যায় যাতে ঘামের মাধ্যমে বাড়তি গরম বেরিয়ে যায়। এই সময় যদি হঠাৎ এসির ঠান্ডা হাওয়া বা বরফ ঠান্ডা জল শরীরে লাগে, রক্তনালীগুলো আচমকা সংকুচিত হয়ে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে Vasoconstriction বলে। এই হঠাৎ ওঠানামাকেই থার্মাল শক বলে। সহজ কথায়, গরম শরীরে হঠাৎ ঠান্ডার ধাক্কা।
থার্মাল শকের ৪টি মারাত্মক বিপদ
থার্মাল শককে অনেকে সর্দি-জ্বর ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু এর পরিণতি অনেক ভয়ংকর হতে পারে।
১. হার্ট ও BP এর সমস্যা: হঠাৎ রক্তনালী সংকুচিত হলে ব্লাড প্রেশার লাফিয়ে বেড়ে যায়। যাদের হাই BP বা হার্টের সমস্যা আছে তাদের হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
২. মস্তিষ্কে প্রভাব: মস্তিষ্কে হঠাৎ রক্ত চলাচল কমে গেলে মাথা ঘোরা, বমি, চোখে অন্ধকার দেখা, এমনকি সাময়িক জ্ঞান হারানোর মতো ঘটনা ঘটে।
৩. মাংসপেশি ও স্নায়ুর ক্ষতি: পায়ের পেশিতে হঠাৎ টান ধরে, "ক্র্যাম্প" হয়। অনেক সময় স্নায়ু দুর্বল হয়ে হাত পা ঝিনঝিন করে।
৪. ইমিউনিটি কমে যাওয়া: হঠাৎ তাপমাত্রার ধাক্কায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা, জ্বর লেগেই থাকে।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন:
থার্মাল শক সবার জন্যই ক্ষতিকর, তবে কিছু মানুষের জন্য এটা একদমই বিপজ্জনক।
১. হাই BP ও হার্টের রোগী: এদের রক্তনালী আগে থেকেই দুর্বল থাকে। হঠাৎ সংকোচন সহ্য করতে পারে না।
২. বাচ্চা ও বয়স্ক মানুষ: এদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কম। তাই অল্পতেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।
৩. অ্যাজমা ও মাইগ্রেনের রোগী: ঠান্ডা হাওয়া বা জল লাগলেই শ্বাসকষ্ট বাড়ে, মাইগ্রেনের ব্যথা চরমে ওঠে।
৪. ডায়াবেটিসের রোগী: এদের নার্ভ দুর্বল থাকে, তাই তাপমাত্রার পরিবর্তন টের পায় দেরিতে।
গরম থেকে ফিরে বাঁচার ৫টি নিয়ম
আরাম করতে গিয়ে অসুস্থ হবেন না। মাত্র কয়েকটা নিয়ম মানলেই থার্মাল শক ১০% এড়ানো সম্ভব।
১. ৫-১০ মিনিট রেস্ট মাস্ট: বাড়ি ফিরেই এসি ছাড়বেন না। প্রথমে পাখার হাওয়ায় বসুন। শরীরের ঘাম শুকতে দিন। শরীর নিজে থেকে ঠান্ডা হতে দিন।
২. বরফ জল নয়, নরমাল জল: গলার তৃষ্ণা মেটাতে ফ্রিজের বরফ জল খাবেন না। মাটির কলসির জল বা নরমাল জল খান। এটা ভিতর থেকে শরীরকে ঠান্ডা করে।
৩. কুসুম গরম জলে স্নান: স্নান করতে ইচ্ছে করলে প্রথমে কুসুম গরম জল দিয়ে গা মুছে নিন। ১০ মিনিট পর ঠান্ডা জলে স্নান করুন। একবারে ঠান্ডা জল গায়ে ঢালবেন না।
৪. এসির তাপমাত্রা 24-26°C রাখুন: বাইরে 40°C আর ঘরে 18°C রাখলে 22 ডিগ্রির ধাক্কা লাগবে। ঘরের তাপমাত্রা আর বাইরের তাপমাত্রার পার্থক্য যেন 5-6°C এর বেশি না হয়।
৫. মুখে সরাসরি হাওয়া নয়: এসির হাওয়া সরাসরি মুখ, ঘাড় বা কপালে লাগাবেন না। এসির হাওয়া ঘুরিয়ে দিন।
শেষ কথা
মনে রাখবেন, "3-3-3" নিয়ম। বাড়ি ফিরে 3 মিনিট বসুন, 3 গ্লাস নরমাল জল খান, আর এসির তাপমাত্রা 3 ডিগ্রি করে কমান। এই ছোট সাবধানতাই আপনাকে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক আর থার্মাল শকের হাত থেকে বাঁচাবে। বাড়ির বয়স্ক বাবা-মা আর ছোট বাচ্চাদের এই নিয়মটা অবশ্যই শেখান।
