বিয়ে করছেন, সংসার পাতছেন, কিন্তু মা হওয়ার কথা উঠলেই পিছিয়ে যাচ্ছেন শহুরে তরুণীরা। ভারতে ‘চাইল্ডফ্রি বাই চয়েস’ ট্রেন্ড বাড়ছে। এর পিছনে শুধু কেরিয়ার নয়, আছে আর্থিক চাপ, শরীর নিয়ে ভয়, সমাজের চাপ আর ‘পারফেক্ট মা’ হওয়ার টেনশন।

সংসারী হলেও মা হতে চাইছেন না তরুণীরা, নেপথ্যে কোন ভীতি? “বিয়ে তো করেছি, কিন্তু এখনই বাচ্চা না” – শহরের ড্রয়িংরুমে এই কথাটা এখন খুব কমন। একটা সময় ছিল যখন বিয়ের ১-২ বছরের মধ্যে সন্তান না এলে পাড়া-পড়শি প্রশ্ন তুলত। এখন সিনারিও উল্টো। শিক্ষিত, স্বাবলম্বী তরুণীরা নিজেরাই মা হতে চাইছেন না। অথবা পিছিয়ে দিচ্ছেন ৩৫-৪০ বছর বয়স পর্যন্ত। কিন্তু কেন?

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

১. কেরিয়ারের ঘড়ি বনাম বায়োলজিক্যাল ক্লক মেয়েদের কেরিয়ারের পিক টাইম ২৫-৩৫ বছর। আবার সন্তানধারণের সেরা সময়ও ওটাই। দুটো ঘড়ি একসাথে চলে। কর্পোরেটে ৬ মাসের ম্যাটারনিটি লিভ থাকলেও, ফিরে এসে দেখেন জুনিয়র প্রমোশন পেয়ে গেছে। ক্লায়েন্ট হাতছাড়া। ‘মমি ট্র্যাক’-এ চলে যাওয়ার ভয় কাজ করে। স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং করা মেয়েদের তো লিভও নেই। ফলে অনেকে ভাবেন, ‘আগে নিজের পায়ে দাঁড়াই, তারপর বাচ্চা’। দাঁড়াতে দাঁড়াতে বয়স ৩৮।

২. ‘বাচ্চা মানুষ করা’ = ইএমআইয়ের পাহাড় একটা বাচ্চাকে গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত পড়াতে এখন মিনিমাম ৫০-৭০ লাখ খরচ। ভালো স্কুলের ডোনেশন ৫ লাখ, মাসে ফিস ১৫ হাজার। তারপর টিউশন, ডাক্তার, জামাকাপড়, ঘুরতে যাওয়া। দুজনের রোজগারেও টান পড়ে। তার উপর ফ্ল্যাটের ইএমআই, গাড়ির লোন। এই আর্থিক অনিশ্চয়তা জেন জি আর মিলেনিয়ালদের সবচেয়ে বড় ভীতি। তারা নিজেরাই ছোটবেলায় অভাব দেখেছে। নিজের সন্তানকে সেই স্ট্রাগল দিতে চায় না। ‘ডিঙ্ক’ অর্থাৎ Double Income No Kids লাইফস্টাইল তাই পছন্দ।

৩. শরীর আর মনের ভয়: টোকোফোবিয়া থেকে বেবি ব্লুজ প্রেগন্যান্সি মানেই ৯ মাসের শারীরিক কষ্ট, লেবার পেইন, সিজারের কাটা দাগ, স্ট্রেচ মার্ক। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এখন সবাই জানে। ‘টোকোফোবিয়া’ অর্থাৎ প্রসবভীতি এখন মেডিকেল টার্ম। তারপর আছে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন। রাতের পর রাত না ঘুমানো, হরমোনের ওঠানামা, শরীরের শেপ নষ্ট। অনেক মেয়ে সরাসরি বলেন, “আমার শরীর, আমার সিদ্ধান্ত। আমি এই ট্রমা নিতে চাই না।”

৪. ‘পারফেক্ট মা’ হওয়ার সামাজিক চাপ আমাদের সমাজে মা মানে ‘সুপারওম্যান’। অফিস সামলাবে, রান্না করবে, বাচ্চার হোমওয়ার্ক করাবে, শাশুড়ির সেবা করবে। একটু ভুল হলেই কথা শুনবে – ‘কেমন মা তুমি?’। এই ‘মম গিল্ট’ ট্র্যাপে পড়তে চায় না নতুন প্রজন্ম। তারা দেখছে, বাচ্চা হওয়ার পর মেয়েদের নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে যায়। সবাই তাকে ‘অমুকের মা’ বলেই ডাকে। নিজের নাম, শখ, বন্ধু সব সেকেন্ডারি হয়ে যায়। এই আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের ভয়ও কাজ করে।

৫. দুনিয়ার হাল দেখে ভয় ক্লাইমেট চেঞ্জ, যুদ্ধ, চাকরির অনিশ্চয়তা, পলিউশন – খবর খুললেই নেগেটিভিটি। অনেক তরুণ-তরুণী ভাবছেন, ‘এই পৃথিবীতে আমি নিজেই সার্ভাইভ করতে হিমশিম খাচ্ছি, একটা নতুন প্রাণকে কেন আনব?’ পরিবেশকর্মীদের মধ্যে এই ‘বার্থ স্ট্রাইক’ ট্রেন্ড বাড়ছে।

তাহলে কি মাতৃত্ব শেষ হয়ে যাবে? না। বিষয়টা হল ‘চাপিয়ে দেওয়া’ বনাম ‘বেছে নেওয়া’। আগের প্রজন্মের কাছে মা হওয়া ছিল ডিউটি। এখনকার মেয়েদের কাছে এটা চয়েস। যারা মা হচ্ছেন, তারা অনেক ভেবেচিন্তে, প্ল্যান করে হচ্ছেন। আর যারা হচ্ছেন না, তাদের সিদ্ধান্তকেও সম্মান দিতে হবে।

মনোবিদ ড. অনন্যা চ্যাটার্জি বলছেন, “মা না হওয়ার ইচ্ছেটা স্বার্থপরতা নয়। এটা সেলফ-অ্যাওয়ারনেস। আমি যদি মানসিক বা আর্থিকভাবে রেডি না হই, তাহলে জোর করে মা হয়ে বাচ্চাটাকেও কষ্ট দেব। তার চেয়ে না হওয়া ভালো।”

শেষ কথা: সংসার মানেই সন্তান, এই ধারণা ভাঙছে। পরিবার মানে এখন দুজন মানুষ, একটা পোষ্য, বা একটা বাগানও হতে পারে। সমাজের উচিত মেয়েদের জরায়ু নিয়ে প্রশ্ন বন্ধ করা। কারণ মাতৃত্ব শরীরের না, মনের ব্যাপার। আর মন যখন ‘হ্যাঁ’ বলবে না, তখন ‘না’ বলার অধিকার সবার আছে।

সন্তান নেওয়া বা না নেওয়া সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কোনো শারীরিক বা মানসিক সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন।