সকালে গরম, বিকেলে বৃষ্টি, রাতে আবার মনোরম আবহওয়া – আবহাওয়ার এই হঠাৎ বদলেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জ্বর, সর্দি, কাশি, ভাইরাল ফিভার। ডাক্তাররা সতর্ক করছেন, এই সময় ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়ে। শিশু, বয়স্ক আর যাদের অ্যালার্জি আছে তারা বেশি ঝুঁকিতে।  

একদিন ছাতা, পরের দিন রোদচশমা। আবহাওয়ার এই "দোলাচল" শরীরের ওপর সোজা আঘাত করছে। ডাক্তাররা বলছেন, গত ২ সপ্তাহে জ্বর-সর্দি-গলা ব্যথা নিয়ে OPD-তে রোগীর লাইন ৩ গুণ বেড়েছে। কারণ একটাই – আবহাওয়ার হঠাৎ বদল। সকালে ৩২ ডিগ্রি গরমে ঘেমে অফিস গেলেন। বিকেলে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরলেন। রাতে AC চালিয়ে ঘুমোলেন। শরীর এই তাপমাত্রার ধাক্কা সামলাতে পারছে না। ফল? ভাইরাস সহজেই শরীরে ঢুকে পড়ছে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

কেন আবহাওয়া বদলালেই অসুস্থ হই আমরা?

আমাদের শরীরের একটা "থার্মোস্ট্যাট" আছে। বাইরের তাপমাত্রার সাথে মানিয়ে নিতে শরীর খাটে। হঠাৎ গরম থেকে ঠান্ডা, বা শুকনো থেকে স্যাঁতস্যাঁতে হলেই এই সিস্টেম গন্ডগোল করে। ইমিউনিটি ৩০-৪০% কমে যায়। তখন ইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যাডেনো ভাইরাস, ডেঙ্গু, চোখ ওঠা – সব হামলা করে। ডাক্তাররা একে বলছেন "Seasonal Transition Fever"।

বিশেষজ্ঞরা কাদের বেশি সাবধান হতে বলছেন?

১. ৫ বছরের নিচে শিশু: ওদের ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে, তাই জ্বর-নিউমোনিয়া দ্রুত হয়।

২. ৬০+ বয়স্ক: বয়সের সাথে ফুসফুস দুর্বল। সর্দি থেকেই বুকে সর্দি বসে যায়।

৩. অ্যাজমা-অ্যালার্জি রোগী: আবহাওয়া বদল মানেই ওদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়।

৪. ডায়াবেটিস-প্রেসারের রোগী: এদের রোগ সারতে সময় বেশি লাগে, জটিলতা বেশি।

ডাক্তারদের দেওয়া ৭টি জরুরি সতর্কতা – আজই মানুন

১. "লেয়ার" করে পোশাক পরুন

সকালে একটা পাতলা গেঞ্জি, ব্যাগে এক্সট্রা জমা রাখুন। বিকেলে বৃষ্টি হলে বা AC-তে ঢুকলে গায়ে দিয়ে নিন। হঠাৎ ঠান্ডা লাগতে দেবেন না। ঘামে ভেজা জামা গায়ে বসে থাকবেন না একদম।

২. জল ফুটিয়ে খান, বাইরের জল বাদ

আবহাওয়া বদলের সময় জলবাহিত রোগ ডায়েরিয়া, টাইফয়েডও বাড়ে। বাড়ির জল ফুটিয়ে, ঠান্ডা করে খান। রাস্তার কাটা ফল, জুস, আইসক্রিম এখন ২ সপ্তাহ এড়িয়ে চলুন। পেট খারাপ হলেই শরীর আরও দুর্বল হবে।

৩. হাত ধোয়াটা "ধর্ম" বান

ভাইরাস হাতে লেগে নাক-মুখ দিয়েই ঢোকে। বাইরে থেকে এসে, খাওয়ার আগে, বাথরুমের পর ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধুন। স্যানিটাইজার ব্যাগে রাখুন। এটা ছোট কাজ, কিন্তু ৮০% ভাইরাল জ্বর আটকে দেবে।

৪. ঘুম আর স্ট্রেস – দুটোই কন্ট্রোল করুন

রাত জাগলে ইমিউনিটি ভেঙে পড়ে। দিনে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম মাস্ট। আর টেনশন করবেন না। স্ট্রেস হরমোন "কর্টিসল" বাড়লে শরীরের লড়াই করার ক্ষমতা কমে যায়। ১০ মিনিট চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিন।

৫. ইমিউনিটি বুস্টার খাবার প্লেটে রাখুন

আদা-তুলসি-মধুর চা, লেবু, আমলকি, পেপে, বাদাম, দই – রোজ খান। ভিটামিন C আর জিঙ্ক শরীরের ঢাল। সকালে খালি পেটে এক চামচ মধু + ৪ ফোঁটা লেবু জলে মিশিয়ে খেতে পারেন। ওষুধের চেয়ে এটা সস্তা আর নিরাপদ।

৬. ঘর শুকনো আর হাওয়া চলাচল রাখুন

বৃষ্টির জন্য জানলা বন্ধ করে রাখবেন না। দিনে ১ ঘণ্টা রোদ-হাওয়া ঢুকতে দিন। ঘরে যেন স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ বা দেওয়ালে ফাঙ্গাস না ধরে। ফাঙ্গাসের স্পোর নাক দিয়ে ঢুকেই অ্যালার্জি আর কাশি বাধায়।

৭. "এটা সামান্য জ্বর" ভেবে অবহেলা নয়

১০ ডিগ্রির ওপর জ্বর ৩ দিনের বেশি থাকলে, শ্বাসকষ্ট হলে, পেটে ব্যথা বা র‍্যাশ বেরোলে ডাক্তার দেখান। এখন ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াও একই রকম জ্বর দিয়ে শুরু হয়। নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না। ভাইরাল জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না, উল্টো ক্ষতি হয়।

লক্ষণ দেখে বুঝবেন কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন :

জ্বরের সাথে যদি শ্বাস নিতে কষ্ট, বুকে ব্যথা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, পেটে লাগাতার ব্যথা, ঠোঁট-জিভ নীল হয়ে যাওয়া দেখেন – সাথে হাসপাতাল। "Warning sign" মিস করবেন না।

শেষ কথা

আবহাওয়া আমরা বদলাতে পারব না। কিন্তু নিজেকে বদলাতে পারব। এই ২-৩ সপ্তাহ একটু সাবধান থাকুন।

মনে রাখবেন, প্রতিরোধ মানে হাসপাতালের বিল আর কষ্ট দুটোই বাঁচানো। আজকের ৭টা ছোট নিয়ম, কালকের বড় অসুখ আটকাবে।

শরীর আপনার, যত্নটাও আপনারই নিতে হবে।