দার্জিলিং-ম্যালে পা ফেলার জায়গা নেই? AC-র ঠান্ডা ছেড়ে ‘ন্যাচারাল এসি’ নিতে চলুন ৩ অফবিট গ্রামে। বাংকুলুং-এ বালাসন নদীর পাশে তাঁবু, চিমনিতে ব্রিটিশ যুগের ২৪ ফুট চিমনি আর পাইন বন, রিশপ-রামধুরায় ঘর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ১৮০° ভিউ। ভিড় নেই, হর্ন নেই, আছে মেঘ, পাখির ডাক আর হোমস্টের ধোঁয়া ওঠা মোমো। মে-জুনেও কম্বল মুড়ি দিতে হবে।
গরমে হাঁসফাঁস করছেন? দার্জিলিং ভাবলেই মাথায় আসে ম্যালের ভিড়, হোটেলের ডবল রেট, আর গাড়ির লম্বা জ্যাম। কিন্তু NJP থেকে ২-৩ ঘণ্টার মধ্যেই এমন ৩ গ্রাম আছে, যেখানে ট্যুরিস্ট বাস ঢোকে না। ফোনের টাওয়ার যায়-আসে। আর সকালের অ্যালার্ম দেয় পাহাড়ি ময়না। এই গরমে ‘মেঘের দেশে’ ছুটি কাটাতে চলুন বাংকুলুং, চিমনি আর রিশপ-রামধুরা।

১. বাংকুলুং – নদীর ধারে ক্যাম্পিং, চা-বাগানের গ্রাম
কোথায়: মিরিক থেকে ১০ কিমি, NJP থেকে ৪৫ কিমি। উচ্চতা ২২০০ ফুট।
কেন যাবেন: বালাসন নদীর ধারে ছোট্ট উপত্যকা। একদিকে চা-বাগান, অন্যদিকে ঘন জঙ্গল। গ্রামের মাঝে ব্রিটিশ আমলের পরিত্যক্ত চা-ফ্যাক্টরি। ‘বাংকুলুং’ মানে লেপচা ভাষায় ‘জঙ্গলের বাঁক’।
কী দেখবেন:
- বালাসন রিভার ক্যাম্প: নদীর বোল্ডারে বসে পা ডোবান। রিভার ক্যাম্পিং, ফিশিং হয়। রাতের বেলা নদীর শব্দে ঘুম।
- গোপালধারা টি এস্টেট: ৫ কিমি দূরে। এশিয়ার উঁচু চা-বাগানগুলোর একটা। টি-টেস্টিং মাস্ট।
- থার্বো হর্স রাইডিং: মিরিক যাওয়ার পথে ঘোড়ায় চড়া।
কী করবেন: কিছু না। নদীর পাথরে বসে বই পড়ুন। রাতে বনফায়ার, বার্বিকিউ। এটাই ‘সাসেগাদ’।
থাকা: হাতে গোনা ৪-৫টা হোমস্টে ও ক্যাম্প। ‘River Valley Camp’, ‘Bunkulung Retreat’। ১৪০০-২০০০ টাকা জনপ্রতি, থাকা-খাওয়া-বনফায়ার সহ।
বেস্ট টাইম: অক্টোবর-জুন। বর্ষায় নদী ভয়ংকর, রাস্তা ধসে।
২. চিমনি – ২৪ ফুটের রহস্যময় চিমনি, পাইনের জঙ্গল
কোথায়: কার্শিয়াং থেকে ৯ কিমি, দার্জিলিং থেকে ২৮ কিমি। উচ্চতা ৭০০০ ফুট।
কেন যাবেন: ব্রিটিশ আমলে ডাকবাংলো ছিল। শীতে ঘর গরম রাখতে বানানো ২৪ ফুট উঁচু চিমনি এখনও দাঁড়িয়ে। তার থেকেই গ্রামের নাম ‘চিমনি’। চারপাশে ঘন পাইন, ধুপি ফরেস্ট। মেঘ এসে ঘরে ঢোকে।
কী দেখবেন:
- হেরিটেজ চিমনি: ১৮৩৯ সালের তৈরি। চিমনির গায়ে উঠে ফটো তুলুন।
- ডাউহিল পাইন ফরেস্ট: কার্শিয়াং-এর বিখ্যাত ‘হন্টেড’ জঙ্গল। দিনের বেলায় মিস্টি, মায়াবী। গাইড নিয়ে হাঁটুন।
- ঈগলস ক্র্যাগ: কার্শিয়াং ভিউ পয়েন্ট। নিচে রোহিণী, বালাসন ভ্যালি।
- সানরাইজ: ভোরে হোমস্টের ছাদ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা-সহ স্লিপিং বুদ্ধ।
কী খাবেন: লোকাল দিদির হাতে থুকপা, গুন্দ্রুক, স্কোয়াশের চিপস, কিনেমা।
থাকা: ৩-৪টা হোমস্টে। ‘Chimney Heritage Homestay’, ‘Salamander Jungle Camp’। ১৫০০-১৮০০ টাকা জনপ্রতি।
টিপস: ঠান্ডা বেশি। জ্যাকেট, টুপি মাস্ট। লেপার্ড জোন, রাতে একা বেরোবেন না।
৩. রিশপ-রামধুরা – কাঞ্চনজঙ্ঘার বারান্দা
কোথায়: কালিম্পং থেকে ২৮ কিমি। রিশপ ৮৫০০ ফুট, রামধুরা ৫০০ ফুট। দুটো পাশাপাশি গ্রাম।
কেন যাবেন: ‘রিশপ’ মানে ‘পাহাড়ের মাথায়’। ১৮০° কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জ। ঘর থেকে বেরোতেই তুষার। রামধুরা একটু নিচে, কম ঠান্ডা, বেশি সবুজ। দুটোই ‘জিরো পয়েন্ট’ টাইপ ফিল।
কী দেখবেন:
- টিফিনদারা ভিউ পয়েন্ট: রিশপ থেকে ১.৫ কিমি ট্রেক। ৩৬০° ভিউ। নাথুলা, জেলেপলা, কাঞ্চনজঙ্ঘা সব এক ফ্রেমে।
- নেওড়া ভ্যালি ফরেস্ট: রিশপের পাশেই। রেড পান্ডা, পাখির স্বর্গ। পারমিট লাগে।
- জলসা বাংলো: রামধুরায় ব্রিটিশ বাংলো। সামনে উপত্যকা, পিছনে পাইন।
- ইচ্ছেগাঁও: রামধুরা থেকে হাঁটা পথ। আরও নিরিবিলি।
কী করবেন: সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে চা, বিকালে মেঘের ভিতর হাঁটা, রাতে মিল্কি ওয়ে।
থাকা: রিশপে ‘Soham Homestay’, ‘Hotel Sonar Bangla’। রামধুরায় ‘Pabira Homestay’, ‘Karma Homestay’। ১৩০০-১৯০০ টাকা।
টিপস: রিশপে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। বয়স্করা রামধুরায় থাকুন। গরম জল চাইলে আগে বলবেন।
কীভাবে যাবেন ৩ গ্রাম?
বেস NJP/বাগডোগরা।
- বাংকুলুং: NJP → মিরিক শেয়ার গাড়ি ২৫০ টাকা → মিরিক থেকে রিজার্ভ ৬০০ টাকা। মোট ২.৫ ঘণ্টা।
- চিমনি: NJP → কার্শিয়াং শেয়ার ২০০ টাকা → কার্শিয়াং থেকে রিজার্ভ ৮০০ টাকা। মোট ৩ ঘণ্টা।
- রিশপ-রামধুরা: NJP → কালিম্পং শেয়ার ৩০০ টাকা → কালিম্পং থেকে রিশপ রিজার্ভ ১৫০০ টাকা। মোট ৪.৫ ঘণ্টা।
ডাইরেক্ট রিজার্ভ করলে NJP থেকে বাংকুলুং ২৮০০, চিমনি ৩২০০, রিশপ ৪০০০ টাকা।
৪ দিনের কম্বো প্ল্যান ও বাজেট
দিন ১: NJP → বাংকুলুং। নদী, ক্যাম্পফায়ার।
দিন ২: বাংকুলুং → চিমনি ভায়া মিরিক। পাইন ফরেস্ট, চিমনি।
দিন ৩: চিমনি → রিশপ। টিফিনদারা সানসেট।
দিন ৪: রিশপ → NJP ভায়া রামধুরা, ডেলো পার্ক।
খরচ ২ জনের: ১৬,০০০-১৮,০০০ টাকা। গাড়ি, থাকা, খাওয়া। দার্জিলিং-এর অর্ধেক।
৫টা জিনিস মাথায় রাখুন
১. নেটওয়ার্ক: BSNL/Jio চলে। Airtel-Vi দুর্বল। ডাউনলোড করে রাখুন।
২. ATM নেই: ক্যাশ ক্যারি করুন। হোমস্টেতে UPI চলে।
৩. ওষুধ: বমি, জ্বর, ব্যান্ডেজ, দরকারি ওষুধ। ডাক্তার ২০ কিমি দূরে।
৪. জোঁক: বর্ষায় ও বর্ষার পরে জোঁক থাকে। নুন, ওডোমস রাখুন।
৫. প্লাস্টিক বারণ: গ্রামগুলো প্লাস্টিক ফ্রি জোন। বোতল, চিপসের প্যাকেট ফেলবেন না।
শেষ কথা:
দার্জিলিং গেলে ম্যাল, কেভেন্টার্স, ঘোড়ার পিঠ। আর বাংকুলুং-চিমনি-রিশপ গেলে পাবেন নিজেকে।
এখানে হোটেলের বেল বাজে না, মন্দিরের ঘণ্টা বাজে। এখানে গাড়ির হর্ন নেই, ঝিঁঝিঁর ডাক আছে।
এখানে ‘ট্যুর’ হয় না, ‘থাকা’ হয়।
