আপনি কি জানেন, প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে রোজ রাত জাগার এই অভ্যাস আপনার শরীর ও মনের ওপর কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলছে?
"আর মাত্র একটা এপিসোড, তারপরই ঘুমিয়ে পড়ব।" কিংবা "ফেসবুকের স্ক্রলটা শেষ করেই ফোনটা রাখছি।"—এই করতে করতে ঘড়ির কাঁটা কখন যে রাত ২টো বা ৩টে ছুঁয়ে ফেলে, আমরা অনেকেই তা টের পাই না। আধুনিক নাগরিক জীবনে রাত জাগা বা 'নাইট আউল' হওয়াটা এখন একটা ট্রেন্ড। কিন্তু আপনি কি জানেন, প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে রোজ রাত জাগার এই অভ্যাস আপনার শরীর ও মনের ওপর কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলছে?

চিকিৎসক এবং গবেষকদের মতে, পর্যাপ্ত ও সময়মতো ঘুম না হওয়া এক ধরণের নীরব ঘাতক। আসুন জেনে নেওয়া যাক, রোজ রাত জাগলে আমাদের শরীরে ঠিক কী কী ঘটে।
১. মস্তিস্কের কর্মক্ষমতা হ্রাস ও খিটখিটে মেজাজ আমরা যখন ঘুমাই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সারাদিনের ক্ষতিকর টক্সিন বা বর্জ্য পরিষ্কার করে এবং স্মৃতি গুছিয়ে রাখে। রোজ রাত জাগলে মস্তিষ্ক এই বিশ্রামের সময়টুকু পায় না। ফলে পরদিন সকালে:
মনঃসংযোগ করতে তীব্র সমস্যা হয়।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।
সামান্য কারণেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে এবং বিষণ্ণতা (Depression) বা উদ্বেগের (Anxiety) মতো মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।
২. ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতা অনেকেই খেয়াল করেছেন, রাতে দেরি করে ঘুমালে মাঝরাতে খিদে পেয়ে যায়। একে বলা হয় 'মিডনাইট ক্রেভিং'। রাত জাগলে শরীরে ঘড়েলিন (Ghrelin) নামের হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়, যা ক্ষিদে বাড়ায়; আর লেপটিন (Leptin) নামের হরমোনের ক্ষরণ কমে যায়, যা পেট ভরার অনুভূতি দেয়। এর ফলে রাতে ফাস্টফুড বা অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়া হয়, যা দ্রুত ওজন বাড়ায়।
৩. হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ৫-৬ ঘণ্টার কম ঘুমান, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের রক্তচাপ (Blood Pressure) নিয়ন্ত্রণকারী সিস্টেম ঠিকঠাক কাজ করতে পারে না। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস হওয়া আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম ঘুমের মধ্যে সাইটোকাইন (Cytokine) নামের এক ধরণের প্রোটিন তৈরি করে, যা ইনফেকশন বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। আপনি যখন দিনের পর দিন রাত জাগবেন, তখন এই প্রোটিনের উৎপাদন কমে যাবে। ফলে সামান্য ঠাণ্ডা-কাশি থেকে শুরু করে বড় কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর শরীর সহজে সেরে উঠতে চায় না।
৫. ডায়াবেটিসের হাতছানি নিয়মিত রাত জাগলে শরীরের ইনসুলিন হরমোন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি সঠিক সাড়া দেয় না, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে 'ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স' বলা হয়। এর সরাসরি ফলাফল হলো রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া।
৬. ত্বকের বার্ধক্য ও চুল পড়া পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর থেকে কর্টিসল (Cortisol) নামের স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন ত্বকের ইলাস্টিসিটি বা টানটান ভাব নষ্ট করে দেয়। ফলে চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল, চামড়া কুঁচকে যাওয়া এবং অকালে বয়সের ছাপ পড়ে। একই সাথে মানসিক ও শারীরিক চাপের কারণে চুল পড়ার সমস্যাও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: মানবদেহে একটি প্রাকৃতিক ঘড়ি রয়েছে, যাকে বলা হয় 'সার্কাডিয়ান রিদম'। সুস্থ থাকতে হলে এই ঘড়ির সাথে তাল মিলিয়ে চলা জরুরি। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম প্রয়োজন।
কী করবেন?
প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন।
ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন।
বিকেল বা সন্ধ্যার পর চা-কফি খাওয়া এড়িয়ে চলুন।
কাজ বা বিনোদন জীবনের অংশ, কিন্তু স্বাস্থ্যের চেয়ে মূল্যবান কিছুই নয়। আজকের এক ঘণ্টার বাড়তি আনন্দ বা কাজ, ভবিষ্যতের জন্য বড় কোনো রোগ ডেকে আনছে না তো? তাই আজ রাত থেকেই অভ্যাস বদলান, শরীরকে দিন তার প্রাপ্য বিশ্রাম।
