Travel News: দিঘা, পুরুলিয়া, শান্তিনিকেতন ঘুরে বোর হয়ে গেছেন? উইকএন্ডে ভিড় এড়িয়ে একটু নিরিবিলি, একটু রহস্য, একটু অ্যাডভেঞ্চার চান? কলকাতা থেকে মাত্র ৯০ কিমি দূরেই রয়েছে এমন একটা জায়গা, যেখানে আছে ২৫০০ বছরের পুরনো রহস্যময় মন্দির, পাশেই ‘মিনি সুন্দরবন’ আর তার বুকে ভেসে আছে ৩টি নাম না জানা দ্বীপ। ১ রাত ২ দিনেই ঘুরে আসা যায়। রইল কমপ্লিট ট্রাভেল গাইড।
Travel: শনিবার ভোরবেলা বেরিয়ে রবিবার রাতে ফিরে আসা যায়, এমন উইকএন্ড ডেস্টিনেশন খুঁজছেন? কিন্তু দিঘা-মন্দারমণিতে হোটেলের লাইন, পুরুলিয়ায় গরম, ডুয়ার্স অনেক দূর। আপনার জন্য রইল একদম অফবিট প্ল্যান। জায়গাটার নাম বেড়াচাঁপা ও বেড়ির বাওর। উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যে। কলকাতা থেকে দূরত্ব মাত্র ৮৫-৯০ কিমি। গাড়িতে ২.৫ ঘণ্টা।
এখানে কী আছে?
প্রথম, ২৫০০ বছরের পুরনো চন্দ্রকেতুগড়ের খনা-মিহিরের ঢিবি ও রহস্যময় মন্দির। দ্বিতীয়, বিশাল অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বেড়ির বাওর, যাকে লোকে বলে ‘মিনি সুন্দরবন’। আর তৃতীয়, সেই বাওরের বুকে ভেসে থাকা ৩টি জনমানবহীন দ্বীপ – স্থানীয়রা বলে মঙ্গলদীপ, আনন্দদীপ ও শান্তিদীপ।
একটা ট্রিপে ইতিহাস, রহস্য, জঙ্গল, নৌকা, দ্বীপ – সব পাবেন। চলুন, প্ল্যানটা সাজিয়ে ফেলি।
প্রথম দিন: ইতিহাস ও রহস্যের খোঁজে চন্দ্রকেতুগড়
সকাল ৭টা: কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু এয়ারপোর্ট ১ নম্বর ধরে বারাসাত-টাকি রোড ধরুন। টাকি যাওয়ার ১০ কিমি আগেই পড়বে বেড়াচাঁপা। গাড়ি না থাকলে ধর্মতলা থেকে টাকি, বসিরহাটের বাস ধরে বেড়াচাঁপা স্টপেজে নামুন। টোটো রিজার্ভ করে নিন সারাদিনের জন্য – ৫০০-৬০০ টাকা নেবে।
সকাল ১০টা: খনা-মিহিরের ঢিবি ও মিউজিয়াম বেড়াচাঁপায় পৌঁছে প্রথমেই যান চন্দ্রকেতুগড় মিউজিয়াম। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের শহর ছিল এটা। মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে পোড়ামাটির মূর্তি, পুঁতি, মুদ্রা। পাশেই খনা-মিহিরের ঢিবি। লোককথা, জ্যোতির্বিদ খনা ও তাঁর স্বামী মিহির এখানেই থাকতেন। রাজার আদেশে খনার জিভ কেটে নেওয়া হয়েছিল।
দুপুর ১২টা: রহস্যময় ‘চন্দ্রকেতুগড়ের মন্দির’ মিউজিয়াম থেকে ২ কিমি ভিতরে গ্রামের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন, ভাঙা মন্দির। কোনও বিগ্রহ নেই। স্থানীয়রা বলে, এটা তন্ত্রসাধনার জায়গা। পূর্ণিমা-অমাবস্যায় নাকি আজও আলো জ্বলে। গা ছমছমে পরিবেশ। দিনের বেলায় যান, সন্ধ্যার পর একা না যাওয়াই ভালো। গাইড নিন – ১০০ টাকা দিলেই গ্রামের বাচ্চারা ঘুরিয়ে দেখাবে।
দুপুর ২টো: লাঞ্চ ও বেড়ির বাওরে চেক-ইন বেড়াচাঁপায় হোটেল নেই। ৫ কিমি দূরে বেড়ির বাওরের ধারে আছে WBTDC-র ‘মঙ্গলদীপ ট্যুরিস্ট লজ’। অনলাইনে বুক করুন – নন-এসি ১২০০, এসি ১৮০০ টাকা। লজের ক্যান্টিনে ভাত, ডাল, আলুপোস্ত, রুই মাছ খান। ফ্রেশ মাছ, দাম কম।
বিকেল ৪টে: বেড়ির বাওরে নৌকা বিহার ও সূর্যাস্ত এবার আসল মজা। বেড়ির বাওর হল বিদ্যাধরী নদীর মরে যাওয়া অংশ। ৫ কিমি লম্বা অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ। দুপাশে ঘন গরান, হেঁতাল গাছ – সুন্দরবনের ফিল দেবে।
লজ থেকেই নৌকা ভাড়া করুন – ১ ঘণ্টা ৩০০ টাকা। মাঝি আপনাকে নিয়ে যাবে বাওরের বুকে। দেখবেন মাছরাঙা, বক, পানকৌড়ি। ভাগ্য ভালো থাকলে ভোঁদড়ও দেখতে পারেন।
দ্বিতীয় দিন: তিন দ্বীপ অভিযান
ভোর ৬টা: মঙ্গলদীপ ট্রেকিং বাওরের মাঝে সবচেয়ে বড় দ্বীপ মঙ্গলদীপ। নৌকা করে যান। ১০ মিনিট লাগবে। দ্বীপে কোনও মানুষ থাকে না। আছে শুধু ম্যানগ্রোভ আর পাখির ডাক। ভোরবেলা গেলে সূর্যোদয় দেখতে পাবেন। মাঝিই গাইড। জঙ্গলের মধ্যে ১৫ মিনিটের ছোট্ট ট্রেল আছে। অ্যাডভেঞ্চার ফিল পাবেন।
সকাল ৯টা: আনন্দদীপ ও শান্তিদীপ মঙ্গলদীপ থেকে নৌকা নিয়ে আরও ভিতরে গেলে পাবেন বাকি দুটো ছোট দ্বীপ। আনন্দদীপে বাচ্চাদের মতো লাফাতে পারেন, শান্তিদীপে ১০ মিনিট চুপ করে বসে থাকুন। শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি। ফোনের নেটওয়ার্কও পাবেন না।
দুপুর ১২টা: চেক-আউট ও ফেরা লজে ফিরে লাঞ্চ সেরে কলকাতার পথে। চাইলে ফেরার পথে টাকি ঘুরে আসতে পারেন – ২০ কিমি মাত্র। ইছামতীর ধারে বিকেল কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি।
খরচ কত? ১ রাত ২ দিনের জন্য ৪ জনের গ্রুপ হলে: গাড়ি ভাড়া ৩৫০০, লজ ১৮০০, খাওয়া ১২০০, নৌকা-টোটো-গাইড ১০০০ = ৭৫০০ টাকা। মাথাপিছু ১৯০০ টাকা মতো। বাসে গেলে ১২০০ টাকায় হয়ে যাবে।
কবে যাবেন: অক্টোবর থেকে মার্চ বেস্ট টাইম। গরমে যাবেন না। বর্ষায় বাওর ভরে যায়, নৌকা বিহার দারুণ লাগে, কিন্তু কাদা হবে।
কী নেবেন: ওডোমস, টুপি, সানগ্লাস, ক্যামেরা, পাওয়ার ব্যাঙ্ক। লজে জেনারেটর আছে, কিন্তু কারেন্ট যায়।
সাবধানতা: বাওরের জলে নামবেন না। কুমির না থাকলেও গভীর জল। সন্ধ্যার পর দ্বীপে থাকবেন না। জঙ্গলে সাপ থাকতে পারে। মাঝির কথা শুনুন।
এই উইকএন্ডে দিঘার ভিড় নয়, ইতিহাস আর প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যান। ২৫০০ বছরের রহস্য আর তিনটে দ্বীপ আপনার অপেক্ষায়। ব্যাগ গুছিয়ে ফেলুন।
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


