আপনি কি খাঁটি বাঙালি? তাহলে নিশ্চয় আপনার  বাংলা উপন্য়াস পড়ার অভ্য়েস কোনও না কোনও কালে ছিল। আজ হয়তো তা ডিজিটাল মিডিয়ার দাপটে কিছুটা চাপা পড়ে গিয়েছে। কিন্তু  বাঙালি যখন, তাহলে নিজের বাড়ির বইয়ের তাক হাতড়ে বার করে ফেলুন কিছু উপন্য়াস। আর এই লকডাউনের মরশুমে তা পড়ে ফেলুন। মনে রাখবেন, হারিয়ে যাওয়া এই অভ্য়েস কিন্তু আবারও ফিরে পাওয়ার সময় এসেছে আমাদের।

সব বই যেহেতু সবার বাড়িতে থাকে না, তাই তালিকার মধ্য়ে থেকে দেখে নিন, কোনটা আপনার কাছে রয়েছে। তারপর তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে তা পড়ে ফেলুন।  খণ্ড হোক সমগ্র, এই উপন্য়াসগুলোর বেশিরভাগই আপনার বাড়িতে কিন্তু রয়েছে।

জ্য়োতিরিন্দ্র নন্দীর "বারো ঘর এক উঠোন" এক অনবদ্য় উপন্য়াস। যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা তো জানেন, যাঁরা পড়েননি তাঁরাও কিছুটা জানেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ১৯৪০-৫০-এর দশকের মধ্য়বিত্ত কলকাতার এক অবক্ষয়ের ছবি ফুটে উঠেছে এই গল্পে  (প্রসঙ্গত বলি, অবক্ষয়ের কথাটা কিন্তু লেখক নিজেই বলেছেন)। এ-ও শোনা গিয়েছে, বারোঘর এক উঠোনের ওই বস্তিতে গিয়ে উপন্য়াস লেখার জন্য় লেখক নিজেই বাড়ি ছেড়ে পরিবারসুদ্ধ এক বস্তিতে ঘর ভাড়া করে ছিলেন বেশ কিছুদিন! 

গোয়েন্দা গল্প রচনায় তিনি যেমন এক মাইলস্টোন তৈরি করে দিয়ে গিয়েছেন বাংলা সাহিত্য়ে, ঠিক তেমনই  ঐতিহাসিক উপন্য়াসেও তাঁর অবদান ভোলবার মতো নয়। তিনি শরদিন্দু বন্দ্য়োপাধ্য়ায়। তাঁর অন্য়তম সেরা  ঐতিহাসিক উপন্য়াস "তুঙ্গভদ্রার তীরে" পড়ে ফেলুন এই ক-দিনে। দেখবেন, নিজেকে যেন আবার নতুন করে আবিষ্কার করবেন।

বাংলা সাহিত্য়ের তিন বাঁড়ুজ্জে বা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ত্রয়ীকেও  বেছে নিতে পারেন এই সময়ে। মানিক বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের "পুতুল নাচের ইতিকথা" আরও একবার পড়ে ফেলতে পারবেন। যে উপন্য়াসে ডাক্তারের মুখে সেই সংলাপ আজও অনবরত ব্য়বহৃত হয়ে চলেছে বিভিন্ন লেখায়-- "তোমার কি মন নাই কুসুম?"  রবীন্দ্র-পরবর্তীযুগে বাংলা সাহিত্য়ের অন্য়তম সেরা এই মানিক বাঁডুজ্জ্য়েকে যদি বইয়ের তাক থেকে একবার নামিয়ে ফেলেন, তবে বাদ দেবেন না "দিবারাত্রির কাব্য়"ও। এটিও কিন্তু আবার পড়ে ফেলবার মতো উপন্য়াস। দুটির মধ্য়ে একটা উপন্য়াস কিন্তু আপনাকে পড়ে ফেলতেই হবে এই ক-দিনে।

মানিকের পরই যে বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের কথা আসে তিনি হলেন বিভূতিভূষণ। বিভূতিভূষণের  "আরণ্য়ক" যদি আপনি এর আগে অসংখ্য়বারও পড়ে থাকেন, তাহলেও বলব আবার একবার পড়ে ফেলুন। দারুণ লাগবে। এবং সেইসঙ্গে আজকের প্রকৃতি তথা পরিবেশ তথা সভ্য়তার সঙ্কট আপনার কাছে নতুন করে ধরা দেবে।

বিভূতিভূষণের পরেই তারাশঙ্কর বন্দ্য়োপাধ্য়ায়। বাংলা সাহিত্য়ের অন্য়তম এই সেরা লেখকের "হাঁসুলি বাঁকের উপকথা" যদি না-পড়ে থাকেন, তাহলে পড়ে ফেলুন এই বেলা। নইলে জীবনের সবটুকুই ফাঁকি থেকে যাবে।

যে জীবনানন্দকে আমরা চিনি রূপসী বাংলার কবি হিসেবে, তিনি কিন্তু বেশ কয়েকখানা উপন্য়াসও লিখেছেন। হারিয়ে যাওয়া ট্রাঙ্ক থেকে নাকি সেগুলো সব আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই লকডাউনের সময়ে পড়ে ফেলুন জীবনানন্দের অসামান্য় উপন্য়াস "মাল্য়বান"।

এবার একটু এগিয়ে আসা যাক। কবি হিসেবে যতটা বড় ছিলেন, ঔপন্য়াসিক হিসেবেও কিন্তু ঠিক ততটাই উচ্চতা ছুঁয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্য়ায়। সুনীলের "সেই সময়" যদি না-পড়ে থাকেন পড়ে নিন এই বেলা। একটু বড় উপন্য়াস। সময় লাগবে। তাই এই ক-টা দিন হল উৎকৃষ্ট সময়।

সমরেশ মজুমদারের "কালবেলা" পড়ে ফেলতে পারেন এই সময়ে।  নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত এই উপন্য়াস নিয়ে আশির দশকের শেষে বাংলায় একটি টিভি সিরিয়ালও হয়েছিল। খুব সম্ভবত, ক্য়ামেরার সামনে সেটাই ছিল কৌশিক সেনের আত্মপ্রকাশ। উপন্য়াসটি নিয়ে এ প্রজন্মের কাছেও কিন্তু কৌতূহল রয়েছে যথেষ্ট। আজেকের মাওবাদী আন্দোলনের ভিত কিন্তু তৈরি হয়েছিল পশ্চিমবাংলার এক ছোট্ট গ্রাম নকশালবাড়ি থেকে। ষাটের দশকের শেষ ভাগে। সেই নকশালবাড়িই এই উপন্য়াসের পটভূমি।

নবারুণ ভট্টাচার্যের "হারবার্ট" যদি না-পড়ে থাকেন, তাহলে তা পড়ে নিন এইবেলা। হালে, মানে গত দু-তিন দশকে বাংলা ভাষায় অমন উপন্য়াস লেখা হয়নি বলেই অনেক সমালোচকদের মত। হারবার্ট লিখে সাহিত্য় অ্য়াকাডেমি পুরস্কার পান নবারুণ ভট্টাচার্য।

সবশেষে ফিরে যাই রবীন্দ্রনাথে। এই তো সুবর্ণ সুযোগ। তাঁকে ফেলে কি আর বাঙালির ছুটি কাটে। পড়ে ফেলুন রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী উপন্য়াস "গোরা"।