খড়গপুর প্রেমবাজার পেরিয়ে সামান্য গেলেই হিজলি ফরেস্ট ঘেঁষে গোপলি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ক্যানেল বরাবর যে রাস্তা চলে গেছে রাখাল গেড়িয়ার দিকে সেই রাস্তার ওপর সার দিয়ে শুয়ে আছে ক্ষত বিক্ষত দুধের বাছারা। বাঁচার সে কী প্রবল আকুতি? শুক্রবার সকালে গিয়েও দেখা গেল মৃত সহোদরকে টেনে নিয়ে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। কারণ তার সঙ্গে খেলার আর কেউ নেই। 

পথ পশুদের নিয়ে কাজ করা পশুপ্রেমী দেবস্মিতা ও বরুণ আর তাদের সহযোদ্ধা অরুনিমা মুখার্জী , সোমা পাস্তু, রাহুল নিসাদ, সৈকত বাগচীরা জঙ্গলের ভেতর থেকে বস্তা বস্তা লাশ উদ্ধার করেছেন কুকুরের। তারমধ্যে একটি লাশ অপেক্ষাকৃত টাটকা থাকায় সেটি তুলে এনেছিল ময়নাতদন্ত করার জন্য কিন্তু পুলিশ আর ভেটনারি সার্জেন একে ওকে দেখিয়ে বেড়িয়েছে। কী কারণে কুকুরগুলো মারা গেল তার কারণ জানতে কারুরই কোনও উৎসাহ নেই। ব্যাপারটা এরকম, আরে ভাই কুকুর তো, মানুষ তো আর নয়! 
তা ছাড়া কে লড়বে দেশকে সভ্য করার ঠিকা নিয়ে বসে থাকা প্রতিষ্ঠানের অসভ্যতার বিরুদ্ধে! যে লড়বে তাকে ধমকে, ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হবে। যেমনটা চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে হিজলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুমা রায়কে। রুমার বাড়ির সামনে থেকেই আইআইটির নিরাপত্তারক্ষীরা তুলে এনেছিল ১০টি কুকুরকে। 

রুমা দাবি করছিলেন, চার হাজার টাকা দিয়ে চারটি কুকুর ছাড়িয়ে এনেছিলেন। রুমার মারফত খবরটা ছড়িয়ে পড়ে যে আইআইটি তার নিজের ক্যাম্পাসে কুকুর মুক্ত সভ্যতার অভিযান শুরু করেছেন। তারপরই ঝাঁপিয়ে পড়ে বরুণ আর দেবস্মিতার মতো পাগলরা। কিন্তু  বরুণদের মনে হচ্ছে কোন এক অজ্ঞাত কারনে পিছিয়ে গেছে রুমা। 
বরুন আর দেবস্মিতা এবং তাদের দলবল তারপরও হাল ছাড়েনি। খড়গপুর টাউন থানায় যায় এফআইআর করতে। কিন্তু পুলিশ তাঁদের 'পরামর্শ' দেয় মাস পিটিশন করার। মাস পিটিশন হলে তো আর পোষ্ট মার্টম করার দায় থাকেনা পুলিশের। হয়েছেও তাই, ময়নাতদন্ত হয়নি। জানা যায়নি সার সার লাশ বন্দি কুকুর গুলোর মৃত্যুর কারন। অথচ এন আর এস কান্ডে তোলপাড় পড়ে গেছিল। দুই নার্স পড়ুয়ার পড়াই বন্ধ হয়ে গেল মানেকা গান্ধীর হস্তক্ষেপে। 

 বরুণরা দাবি করেছেন, 'এই কুকুরগুলোকেই ক্যাম্পাস থেকে খাওয়ার লোভ দেখিয়ে ধরার পর  ওভারডোজের ঘুমের  ইনজেকশন দিয়ে নারকেল দড়ি দিয়ে নাক মুখ আর পা বেঁধে তুলে নিয়ে আসা হয়েছিল তাতেই অর্ধেকের বেশি মারা গেছে আর বাকি দুর্বল কুকুর গুলোকে ছিঁড়ে খেয়েছে জঙ্গলের কুকুরের দল।
হাল অবশ্য ছাড়েননি বরুনরা। শুক্রবারই মানেকা গান্ধীকে মেল করে এই কুকুরগুলোর নির্মম মৃত্যুর জন্য আইআইটিকে দায়ি করে উপযুক্ত ব্যবস্থার দাবি নিয়েছেন। বিষয়টি আরও জোর লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। খড়গপুর মেদিনীপুরের পাশাপাশি লড়াইয়ে সামিল হওয়ার জন্য বার্তা পাঠানো হয়েছে কলকাতা সহ নানা জায়গায়। 
শুক্রবার সন্ধ্যাতেও আফসোস ঝরে পড়ছে তাঁদের গলায়। এদিন সকালে একটি এনজিওর কর্মকতা বরুন পাল আর ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্টয়ের ছাত্রী দেবস্মিতা পালরা বহু চেষ্টা করেছেন গোপলীর জঙ্গলে ওই একটি মাত্র বেঁচে থাকা কুকুর শাবকের ধরার জন্য। যাতে তাকে চিকিৎসা করে বাঁচানো যায় কিন্তু সে ধরা দেয়নি, মানু্ষের ওপর থেকে বিশ্বাসই উঠে গেছে তার।