দশমী এলেই বাঙালির মন ভারাক্রান্ত। ঢাকের কাঠি থেমে আসে, মা দুর্গার ঘরে ফেরার সময় হয়। কিন্তু বিদায়বেলাটা যেন সবচেয়ে সুন্দর হয়, সেটাই চায় সবাই। আর সেই বিদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচার হল দেবীবরণ। আগে যেখানে পাড়ার দশকর্মা ভান্ডার থেকে কেনা সাধারণ বাঁশের কুলোতেই সেরে যেত বরণ, এখন সেখানেই এসেছে বদলের হাওয়া।

দশমী এলেই বাঙালির মন ভারাক্রান্ত। ঢাকের কাঠি থেমে আসে, মা দুর্গার ঘরে ফেরার সময় হয়। কিন্তু বিদায়বেলাটা যেন সবচেয়ে সুন্দর হয়, সেটাই চায় সবাই। আর সেই বিদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচার হল দেবীবরণ। আগে যেখানে পাড়ার দশকর্মা ভান্ডার থেকে কেনা সাধারণ বাঁশের কুলোতেই সেরে যেত বরণ, এখন সেখানেই এসেছে বদলের হাওয়া। বাঙালি এখন খুঁজছে ডিজাইনার, হ্যান্ডপেন্টেড বরণডালা। ১০০ টাকার কুলোর জায়গা নিচ্ছে ৩০০০ টাকার ডালা, তবুও চাহিদা তুঙ্গে।

দশকর্মা থেকে ডিজাইনার স্টুডিয়ো:

আগে পুজোর ফর্দ মেলাতে একটাই ঠিকানা ছিল - পাড়ার দশকর্মা ভান্ডার। সেখান থেকেই ১০০-১৫০ টাকার বাঁশের কুলো বা পিতলের থালায় সাজানো হত বরণডালা। কিন্তু ২০২৬-এ ছবিটা বদলে গেছে। এখন বরণডালা কিনতে ভিড় হচ্ছে গড়িয়াহাট, কুমোরটুলির ডিজাইনার স্টুডিয়ো আর Instagram, Facebook-এর অনলাইন পেজে। দাম? ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত! তাও অর্ডারের লাইন লেগে আছে দশমীর এক মাস আগে থেকেই।

সংসারের মঙ্গল কামনায় দেবীবরণে আজও সেই একই ভাবে নিষ্ঠাভরে মানা হয় কিছু নিয়ম। স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্র পরে, হাতে শাঁখা-পলা, আলতা-সিঁদুর পরে তবেই শুরু হয় বরণের আচার বিচার। অনেক বাড়িতে আবার বরণের আগে মাছ ছুঁয়ে নেওয়ারও রীতি রয়েছে। আর বরণের মূল আকর্ষণ তো বরণডালা! আগে থেকেই যত্ন করে সাজিয়ে নিতে হয় সেই ডালা। প্রদীপ, মঙ্গলঘট, কলা, পান, সুপারি, হরীতকী, ধান-দূর্বা, সিঁদুর, পানের খিলি, লাল-হলুদ সুতো, কাজললতা, আলতাপাতা, আয়না-চিরুনি, শাঁখা-পলা, লোহা, মিষ্টি আর ষোলো আনা— পুজোর এই সব উপকরণে দিয়েই সেজে ওঠে দেবীর বরণডালা। নিয়মটা একই আছে, বদলেছে শুধু ডালার সাজ। দশকর্মা ভান্ডারের সেই চেনা ছিমছাম বরণডালার দিন এখন অতীত।

কী আছে এই ডিজাইনার ডালায়?

নিয়ম একই আছে, বদলেছে শুধু প্রেজেন্টেশন। ডালায় থাকছে সেই চিরাচরিত উপকরণই - প্রদীপ, পান, সুপারি, হরীতকী, ধান-দূর্বা, সিঁদুর, কাজললতা, আলতা, আয়না-চিরুনি, মিষ্টি। কিন্তু এখন ডালাটাই হয়ে উঠেছে শিল্প। হ্যান্ডপেন্টেড আলপনা, পদ্ম, দুর্গা মুখ, কলকা আঁকা পটচিত্র, লাল-হলুদ গামছা মোড়া সাবেকি লুক, জুট ও হ্যান্ডলুম কাপড়ে মোড়া বোহো লুক, সুপারি পাতা বা কাঠের ইকো-ফ্রেন্ডলি ট্রে - সবই পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ডিজাইনার আবার নাম লেখা পার্সোনালাইজড ডালাও বানিয়ে দিচ্ছেন।

কেন এই বদল?

এই ট্রেন্ডের পিছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, সোশ্যাল মিডিয়া এফেক্ট। সিঁদুরখেলা এখন ইনস্টাগ্রাম ট্রেন্ড, সুন্দর বরণডালা হাতে ছবি না হলে যেন পুজো অসম্পূর্ণ। দ্বিতীয়ত, স্মৃতি হিসাবে রাখা। দশকর্মার কুলো পুজোর পর ফেলে দেওয়া হত, কিন্তু দামি ডিজাইনার ডালা সারা বছর ঘর সাজানোর জিনিস হিসাবে থেকে যায়। তৃতীয়ত, গিফটিং কালচার। অনেকেই বান্ধবী বা নতুন বউকে বরণডালা গিফট করছেন, তাই দাম দিয়েও ভালো জিনিস কিনছেন। নিয়মের সঙ্গে আধুনিকতার এই মেলবন্ধনই বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাঙালি ঐতিহ্য ভোলে না, শুধু তাকে নতুন রূপে সাজিয়ে নেয়।