প্রতিটা বাঙালি বাড়ির উঠোনে থাকে তুলসী মঞ্চ। কিন্তু কেন সেখানে লাল সুতো বাঁধা হয়? শাস্ত্র মতে এর পেছনে লুকিয়ে আছে ৩ টি বড় কারণ আর উপকার।

বাড়ির উঠোনে তুলসী মঞ্চ নেই এমন বাঙালি বাড়ি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি ঠাকুমা-মা সকালবেলা উঠে প্রথমেই তুলসী তলায় জল দেয়। সন্ধ্যা হলেই ধূপ-প্রদীপ জ্বলে। তুলসীকে আমরা শুধু গাছ ভাবি না, মায়ের মতো পুজো করি।

কিন্তু একটা জিনিস খেয়াল করেছেন কি? প্রায় সব বাড়ির তুলসী গাছের গোড়ায় একটা লাল সুতো পেঁচিয়ে বাঁধা থাকে। ছোটবেলায় ভাবতাম এটা বোধহয় সাজানোর জন্য। বড় হয়ে জানলাম এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের শাস্ত্র, জ্যোতিষ আর আমাদের বিশ্বাস।

কেন বাঁধা হয় লাল সুতো? ৩ টি বড় কারণ

১. অশুভ শক্তি আর নজর দোষ থেকে রক্ষা পেতে : শাস্ত্র মতে তুলসী হলেন স্বয়ং মা লক্ষ্মীর অংশ। আর লাল রং হিন্দু ধর্মে শক্তি, সাহস আর সুরক্ষার প্রতীক। মনে করা হয় বাড়ির মূল দরজায় যেমন লাল ফিতে বাঁধলে নেগেটিভ এনার্জি ঢোকে না, ঠিক তেমনই তুলসী গাছে লাল সুতো বাঁধলে পুরো বাড়িটা একটা অদৃশ্য কবচ পেয়ে যায়। কেউ নজর দিলেও সেটা কেটে যায়। বাড়িতে ঝগড়া, অসুখ-বিসুখ কম হয়। তাই পুরনো দিনের মানুষরা বলতেন "তুলসী তলায় লাল সুতো বাঁধলে ঘরে অলক্ষ্মী থাকে না"।

২. স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আর সংসারে শান্তির জন্য : জ্যোতিষ শাস্ত্র বলছে, যাদের কুষ্টিতে শুক্র দুর্বল বা যাদের সংসারে অশান্তি লেগেই আছে, তাদের জন্য তুলসীতে লাল সুতো বাঁধা খুব উপকারী। নিয়ম হল বৃহস্পতিবার সকালে স্নান করে লাল সুতো ৭ বার পেঁচিয়ে বাঁধতে হবে আর ১০৮ বার "ওম নমো ভগবতে বাসুদেবায়" মন্ত্র জপ করতে হবে। এতে মা লক্ষ্মী আর নারায়ণ দুজনেরই কৃপা পাওয়া যায়। আস্তে আস্তে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ে, ভুল বোঝাবুঝি কমে। সংসারে আবার লক্ষ্মীর হাওয়া লাগে।

৩. আর্থিক উন্নতি আর সমৃদ্ধি টেনে আনার জন্য: টাকা-পয়সার টানাটানি যাদের লেগেই আছে, তাদের জন্য এই টোটকা। প্রতি বৃহস্পতিবার তুলসী গাছের গোড়ায় লাল সুতো বেঁধে ঘি এর প্রদীপ জ্বালিয়ে পুজো করুন। তারপর মা লক্ষ্মীর কাছে আর্থিক উন্নতির প্রার্থনা করুন। বিশ্বাস করা হয় তুলসী ছাড়া মা লক্ষ্মীর পুজো সম্পূর্ণ হয় না। তাই যেখানে তুলসী আর লাল সুতো একসাথে থাকে, সেখানে মা লক্ষ্মী স্বয়ং বাস করেন। ব্যবসায় বাধা কাটে, চাকরিতে উন্নতি হয়।

আরও ২ টি উপকার যা অনেকেই জানেন না:

শারীরিক উপকার: লাল রং অনেক পোকা-মাকড়কে দূরে রাখে। তাই তুলসী গাছের গোড়ায় লাল সুতো বাঁধলে পিঁপড়ে, মাকড়সা কম আসে। গাছটাও রোগ-মুক্ত থাকে। আবার তুলসী পাতার মধ্যে যে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল গুণ আছে, লাল সুতো বাঁধা থাকলে সেটা আরও অ্যাক্টিভ হয় বলে মনে করেন অনেকে।

মানসিক শান্তি: সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে লাল সুতো বাঁধা তুলসী গাছে জল দিয়ে প্রণাম করার একটা আলাদা এনার্জি আছে। দিনের শুরুটা পজিটিভ হয়। মন শান্ত থাকে। দুশ্চিন্তা কম হয়। কারণ আপনি জানেন আপনার বাড়ির রক্ষাকর্ত্রী মা তুলসী জেগে আছেন।

বাঁধার সঠিক নিয়ম কী?

মঙ্গলবার বা বৃহস্পতিবার - এই দুই দিন সবচেয়ে শুভ। স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্রে লাল সুতো হাতে নিয়ে প্রথমে মা তুলসীকে প্রণাম করুন। তারপর গাছের গোড়া থেকে উপর পর্যন্ত ৭ বার পেঁচিয়ে বাঁধুন। বাঁধার সময় মনে মনে নিজের মনস্কামনা জানান। তারপর ধূপ-প্রদীপ জ্বালিয়ে দিন।

মনে রাখবেন, শুধু সুতো বাঁধলেই হবে না। রোজ জল দেওয়া, যত্ন করা, ময়লা না ফেলা - এই সেবাটাও করতে হবে। তাহলেই মা তুলসী আশীর্বাদ করবেন।