দেবীপুরাণে দুর্গাপুজোকে অশ্বমেধ যজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আলোর উদযাপনের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্ধকারকে পরাজিত করার প্রাচীন তন্ত্রসাধনা। যার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় ও বিরল আচার হল মহানবমীর রাতের 'শত্রুবলি', যা আজও অনেক বনেদি বাড়িতে নিভৃতে পালিত হয়।

দুর্গাপুজো মানে আমাদের কাছে নতুন জামা, পুষ্পাঞ্জলি আর আড্ডা। কিন্তু এই উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিশ্বকে রক্ষার এক গভীর আকুতি। দেবীপুরাণে তাই দুর্গাপুজোকে সাধারণ উৎসব না বলে 'অশ্বমেধ' যজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন অশ্বমেধ যজ্ঞে রাজা নিজের আধিপত্য ও বিশ্বের কল্যাণের জন্য যজ্ঞ করতেন, তেমনই দুর্গাপুজোও হল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় যজ্ঞ।

আর এই যজ্ঞকে সফল করতে শাস্ত্রে নানাবিধ আচার, রীতিনীতির কথা বলা আছে। আলোর উদযাপনের আড়ালেই রয়েছে অন্ধকারকে পরাজিত করার প্রাচীন তন্ত্রসাধনা। সেই রহস্যময় আচারগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘শত্রুবলি’।

কি এই 'শত্রুবলি' বা 'ছায়াবলি'?

এই আচারে কোনও প্রাণী বলি হয় না। তাই একে ছায়াবলিও বলা হয়। মনে করা হয়, মানুষের ভিতরে এবং বাইরে যে শত্রু বা অশুভ শক্তি রয়েছে, তার প্রতীকী বিনাশই হল শত্রুবলি।

মহানবমীর গভীর রাতে, যখন সন্ধিপুজো শেষ হয়, তখন অনেক বনেদি বাড়ি ও প্রাচীন মন্দিরে নিভৃতে এই আচার পালিত হয়।

এই সময় পুরোহিত চালের গুঁড়ো, কালো তিল বা কুমড়ো দিয়ে শত্রুর মূর্তি বা প্রতীক তৈরি করেন। তারপর মন্ত্র উচ্চারণ করে খড়্গ দিয়ে সেই প্রতীককে ছেদন করা হয়। এর অর্থ হল, দেবীর কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে - "হে দেবী, আমাদের ভেতরের কাম, ক্রোধ, লোভ এবং বাইরের শত্রুদের বিনাশ করো"।

এটি আসলে আত্মশুদ্ধির একটি তান্ত্রিক প্রক্রিয়া। প্রকাশ্যে এর আলোচনা হয় না বলেই এটি আজও রহস্যে ঘেরা। তাই দুর্গাপুজো কেবল উৎসব নয়, এটি এক প্রাচীন শক্তি সাধনা, যেখানে আলোর জয়গানের জন্য অন্ধকারের প্রতীকী বলি আজও অপরিহার্য।