কোজাগরী পূর্ণিমায় বাঙালির ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজো, কিন্তু জানেন কি ভারতের নানা রাজ্যে দেবী লক্ষ্মী পূজিত হন ভিন্ন নামে, ভিন্ন রূপে? দক্ষিণে বরলক্ষ্মী, ওড়িশায় মাণবসা গুরুবার, আর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে লুকিয়ে আছে এমন সব রীতি যা শহুরে পুজোর থেকে একেবারে আলাদা।

আমরা বাঙালিরা লক্ষ্মীপুজো বলতে বুঝি কোজাগরী পূর্ণিমার রাতের আলপনা, ধানের ছড়া, নাড়ু-মোয়ার আয়োজন। কিন্তু ভারতের মানচিত্রে একটু চোখ রাখলেই দেখবেন, সম্পদের দেবী এক এক রাজ্যে এক এক রূপে ধরা দেন। তাঁর ব্রত, মন্ত্র, আচার সবই আলাদা।

১. দক্ষিণ ভারতে ‘বরলক্ষ্মী ব্রতম’ - সধবার পুজো: তামিলনাড়ু, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশে শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হয় বরলক্ষ্মী ব্রত। এটি মূলত বিবাহিত মহিলাদের পুজো। মনে করা হয়, এই দিন দেবী লক্ষ্মী বর বা আশীর্বাদ দিতে আসেন। মাটির বা পিতলের কলসের উপর দেবীর মুখ বসিয়ে, শাড়ি পরিয়ে, গয়না দিয়ে সাজিয়ে পুজো করা হয়। স্বামীর মঙ্গল ও সংসারের সমৃদ্ধি কামনাই এর উদ্দেশ্য। আমাদের কোজাগরীর মতো এখানে আলপনা নয়, কলস-ই দেবীর প্রতীক।

২. ওড়িশার ‘মাণবসা গুরুবার’ - কৃষকের লক্ষ্মী: ওড়িশায় মার্গশীর্ষ মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার পালিত হয় মাণবসা গুরুবার। এটি ওড়িশার সবচেয়ে জনপ্রিয় লক্ষ্মী ব্রত। এখানে লক্ষ্মী শুধু ধনের দেবী নন, তিনি শস্যের দেবী। ঘরের উঠোন থেকে ধানক্ষেত পর্যন্ত লক্ষ্মীর পা এঁকে, ধান দিয়ে তৈরি ‘মাণ’ বা পাত্র ভরে দেবীকে আহ্বান করা হয়। এই পুজোয় জাতপাতের ভেদাভেদ মানা হয় না। কথিত আছে, নিম্নবর্ণের চাষি শ্রীয়ার ভক্তিতে তুষ্ট হয়েই দেবী এই ব্রত প্রচলন করেছিলেন।

৩. মহারাষ্ট্রের ‘মহালক্ষ্মী’ ও গুজরাটের দীপাবলির লক্ষ্মী: মহারাষ্ট্রে ভাদ্র মাসে ৩ দিন ধরে মহালক্ষ্মীর পুজো হয়, যা অনেকটা আমাদের দুর্গাপুজোর মতো। আর গুজরাট ও উত্তর ভারতে দীপাবলির রাতে গণেশের সঙ্গে লক্ষ্মীর পুজো হয়, যা মূলত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের নতুন খাতা পুজো।

এবার আসি আমাদের পশ্চিমবঙ্গে, এখানকার গ্রামের বিচিত্র রীতি:

শহরের কোজাগরী পুজোর বাইরেও বাংলার গ্রামে লক্ষ্মী একেবারে ঘরের মেয়ে।

ক) বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার ‘গরু-খুটা’ লক্ষ্মী: এই অঞ্চলে কোজাগরীর পরদিন গরুকে সাজিয়ে লক্ষ্মীজ্ঞানে পুজো করা হয়। গরুই তো কৃষকের লক্ষ্মী।

খ) পূর্ব মেদিনীপুরের ‘ডাক লক্ষ্মী’: এখানে মূর্তি নয়, ধানের গোলা বা ‘মরাই’-কে লক্ষ্মী রূপে পুজো করা হয়। সারা বছর যাতে গোলা ভরা থাকে, সেই প্রার্থনা।

গ) সুন্দরবনের ‘নৌকা লক্ষ্মী’: সুন্দরবনের মৎস্যজীবী পরিবারে নৌকাকে ধুয়ে-মুছে আলপনা দিয়ে লক্ষ্মীপুজো করা হয়। নৌকাই তাদের জীবিকা, তাই নৌকাই লক্ষ্মী।

ঘ) বীরভূমের ‘সরা লক্ষ্মী’: এখানে মাটির সরার উপর লক্ষ্মীর ছবি এঁকে পুজো করার রীতি আজও আছে। প্রতিমা কেনার সামর্থ্য নেই, তাই সরাতেই দেবীর বাস।

আসলে লক্ষ্মী মানে শুধু টাকা নয়, যা আমাদের জীবন ধারণ করে, যা আমাদের অন্ন জোগায়, তাই-ই লক্ষ্মী। তাই কোথাও তিনি ধানের বস্তা, কোথাও গরু, কোথাও নৌকা, আবার কোথাও বরদাত্রী বরলক্ষ্মী। রূপ ভিন্ন হলেও আরাধনা একটাই - ‘এসো মা লক্ষ্মী, বসো ঘরে।’