এই বছর কবে পালন করবেন নীলষষ্ঠী? দেখুন শুভ সময়, পালনের নিয়ম ও মাহাত্ম্য
২০২৬ সালের নীলষষ্ঠীর সঠিক তারিখ, পুজোর সময় এবং নীল বাতি দেওয়ার শুভ মুহূর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। সন্তানদের দীর্ঘায়ু কামনায় নীলষষ্ঠীর ব্রত পালনের নিয়ম ও পৌরাণিক কাহিনী এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ—এই প্রবাদটি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বছরের নানা উৎসবের মধ্যে চৈত্র মাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্বণ হলো নীলষষ্ঠী। বিশেষ করে সন্তানদের মঙ্গল, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে বাংলার মায়েরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই ব্রত পালন করে থাকেন। ২০২৬ সালে নীলষষ্ঠী কবে পড়ছে এবং এই ব্রত পালনের সঠিক নিয়ম ও মাহাত্ম্য কী, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল তুঙ্গে।
নীলষষ্ঠী ২০২৬-এর তারিখ ও সময়সূচি:
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা ও গণনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নীলষষ্ঠী বা নীল পূজা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৩ এপ্রিল, সোমবার]। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি হলো ৩০ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। ২০২৬ সালে নীলষষ্ঠীর দিন সন্তানদের মঙ্গলের জন্য 'নীল বাতি' জ্বালানোর সবচেয়ে বিশেষ সময় হলো বিকেল ৫টা ২ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটের মধ্যে।
নীলষষ্ঠীর পৌরাণিক মাহাত্ম্য:
লোককথা ও পুরাণ অনুযায়ী, নীলষষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য হলো সন্তানের মঙ্গল কামনা করা। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে, রাজা দক্ষের যজ্ঞে স্বামী শিবের অপমান সহ্য করতে না পেরে সতী আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রাজা নীলধ্বজের কন্যা নীলাবতী হিসেবে পুনর্জন্ম গ্রহণ করেন এবং মহাদেবের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন এই বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল বলেই দিনটি নীলষষ্ঠী বা নীল পূজা হিসেবে পরিচিত।
অন্য একটি ব্রতকথা অনুযায়ী, কাশীর এক ধার্মিক ব্রাহ্মণ দম্পতির সন্তানরা অকালে মারা যেত। শোকাতুর অবস্থায় মা ষষ্ঠী বৃদ্ধার বেশে তাঁদের দেখা দেন এবং চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন উপবাস থেকে শিবের আরাধনা ও নীলের ঘরে বাতি দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই থেকে মায়েরা "আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে"—এই চিরন্তন প্রার্থনা নিয়ে নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন।
পালনের নিয়ম ও উপচার: নীলষষ্ঠীর দিন মায়েরা সারাদিন নির্জলা উপবাস পালন করেন। সন্ধ্যার সময় শিবলিঙ্গে জল ও দুধ অর্পণ করে তবেই উপবাস ভঙ্গ করার রীতি রয়েছে। শিবের প্রিয় উপচার হিসেবে পুজোর থালায় থাকে—কাঁচা দুধ, দই, ঘি, মধু, চিনি (পঞ্চামৃত), গঙ্গাজল, বেলপাতা, চন্দন, আতপ চাল, নীল অপরাজিতা ফুল, ধুতরা ফুল এবং আকন্দ ফুলের মালা।
সন্তানের নামে শিবলিঙ্গের সামনে ঘিয়ের প্রদীপ বা মোমবাতি জ্বালানো হয়, যাকে 'নীল বাতি দেওয়া' বলা হয়। পুজোর পর প্রসাদ খেয়ে ব্রতভঙ্গ করার সময় অন্ন বা ভাত খাওয়া নিষিদ্ধ। পরিবর্তে ফল, সাবুদানা, মিষ্টি অথবা ময়দার তৈরি নিরামিষ খাবার (যেমন লুচি) গ্রহণের বিধান রয়েছে।
নীলষষ্ঠী ও লোকসংস্কৃতি:
নীলষষ্ঠীর পরের দিনই চৈত্র সংক্রান্তি এবং তার পরের দিন শুরু হয় শুভ নববর্ষ। এই সময় গ্রাম বাংলায় গাজন ও চড়ক উৎসব পালিত হয়। অনেক জায়গায় ভক্তরা শিব-পার্বতীর সাজে ঘরে ঘরে ঘুরে ভিক্ষা সংগ্রহ করেন এবং নীলের গান বা অষ্টক গান গেয়ে বেড়ান।

