Rathyatra 2026: রথ চলার আগে পুরীর রাজা নিজে সোনার ঝাঁটা দিয়ে রাস্তা ঝাড় দেন। এই রীতির নাম ছেরা পহরা। কিন্তু দামি ধাতু যখন ব্যবহার করতেই হবে, তখন রুপো বা তামা নয়, সোনা কেন? এর উত্তর জানলে আপনি জগন্নাথ দেবের সমতা আর ভক্তির আসল মানে বুঝতে পারবেন। বিশদে জানতে পড়ুন সম্পূর্ণ প্রতিবেদন…
Rathyatra 2026: ভিড় জমতে শুরু করেছে বড়দাণ্ডায়। কিন্তু রথে দড়ি পড়ার আগে পুরীতে যে দৃশ্যটা হয়, সেটা দেখলে চোখে জল আসে। ওই দিন পুরীর গজপতি মহারাজ, যিনি কিনা একটা রাজ্যের মালিক, তিনি নিজে সোনার তৈরি একটি ঝাঁটা হাতে তুলে নেন। তারপর জগন্নাথ, বলভদ্র আর সুভদ্রার রথের সামনের রাস্তা তিনি নিজে ঝাড় দেন। চারপাশে তখন শঙ্খের আওয়াজ, ঢাকের বাদ্যি আর "জয় জগন্নাথ" ধ্বনি। এই পবিত্র রীতির নাম "ছেরা পহরা"।
কিন্তু এখানেই সবার মনে একটা প্রশ্ন আসে। ঝাড় দেওয়ার জন্য ঝাঁটা তো বাঁশেরও হয়। আর রাজা যখন দামি ধাতুর ঝাঁটা ব্যবহার করবেনই, তখন সেটা রুপোর হতে পারত, তামার হতে পারত। সবচেয়ে দামি ধাতু সোনা কেন বেছে নেওয়া হল? এর পেছনে শুধু ঐশ্বর্য দেখানো নেই। এর পেছনে লুকিয়ে আছে তিনটে গভীর কারণ।
প্রথম কারণ হল-
ভক্তি আর অহংকার ত্যাগ। পুরীর রাজা নিজেকে কখনো রাজা ভাবেন না। তিনি নিজেকে বলেন "জগন্নাথের দাসানুদাস"। অর্থাৎ জগন্নাথের দাসেরও দাস। রথযাত্রার দিন তিনি এই কথাটা কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেন। সোনা হল রাজার ঐশ্বর্যের প্রতীক। আর ঝাঁটা হল সেবার প্রতীক। রাজা সোনার ঝাঁটা হাতে নিয়ে গোটা দুনিয়াকে বোঝান যে, আমার কাছে আমার রাজ্য, আমার মুকুট, আমার ক্ষমতা সবই তুচ্ছ। প্রভুর সেবার কাছে সব অহংকার আমি ঝেড়ে ফেললাম। আমি আজ রাজা নই, আমি একজন সাধারণ ঝাড়ুদার।
দ্বিতীয় কারণ হল পবিত্রতা। আমাদের শাস্ত্রে সোনাকে সবচেয়ে পবিত্র ধাতু বলা হয়েছে। রুপো বা তামা সময়ের সাথে কালো হয়ে যায়, তাতে মরচে ধরে। কিন্তু সোনা হাজার বছর পরেও যেমন ছিল তেমনই থাকে। জগন্নাথ দেব হলেন "দারুব্রহ্ম"। কাঠের মধ্যে তিনি বিরাজ করেন। তাঁর যাত্রার পথ তাই হতে হবে সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত। যে ঝাঁটা দিয়ে সেই পথ পরিষ্কার করা হবে সেটিও হতে হবে সবচেয়ে পবিত্র। তাই সোনার ঝাঁটা বেছে নেওয়া। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় প্রভুর পথে যেন কোনো জাতপাতের, কোনো হিংসার, কোনো অহংকারের ধুলো না থাকে।
আর তৃতীয় কারণটাই সবচেয়ে বড়। সেটা হল সমতা। ছেরা পহরা শুধু রাস্তা ঝাড় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাস্তা ঝাড় দেওয়ার পর রাজা ওই সোনার ঝাঁটা জলে ডুবিয়ে সেই জল চার বর্ণের মানুষের গায়ে ছিটিয়ে দেন। ব্রাহ্মণ থেকে শূদ্র, ধনী থেকে গরিব, সবাই ওই জল মাথায় নেন। এমনকি রাজা নিজে নিচু জাতের মানুষদের পা ধুইয়ে দেন। রথের এই তিন দিনের জন্য পুরীর রাজপথে কোনো উঁচু-নিচু নেই। সবাই জগন্নাথের সন্তান। রাজা এই কাজটা করে বুঝিয়ে দেন যে ক্ষমতা মানে শাসন নয়, ক্ষমতা মানে সেবা।
তাই সোনার ঝাঁটা নিছক লোক দেখানোর জন্য নয়। প্রতি বছর এই রীতির মাধ্যমে জগন্নাথ দেব আমাদের তিনটে শিক্ষা দেন। অহংকার ত্যাগ করো, মনকে পবিত্র রাখো আর সবাইকে সমান চোখে দেখো।
রথের দড়িতে হাত দেওয়ার আগে যখন দেখবেন একজন রাজা ঝাঁটা হাতে রাস্তা পরিষ্কার করছেন, তখন বুঝবেন ধর্ম কত সুন্দর হতে পারে। ধর্ম শুধু মন্ত্র আর উপাচার নয়। ধর্ম হল বিনয়, ধর্ম হল সেবা আর ধর্ম হল মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।
আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


