যোগী সরকারের ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে উত্তরপ্রদেশের কৃষিতে বিরাট পরিবর্তনের দাবি করলেন রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী সূর্য প্রতাপ শাহী। তাঁর দাবি, ৮৬ লক্ষ কৃষকের ঋণ মকুব করা হয়েছে, সেচ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, খাদ্যশস্য উৎপাদনে রেকর্ড হয়েছে এবং আখ চাষিদের বকেয়া মেটানো হয়েছে।

উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে এখন যোগী সরকারের ৯ বছর পূর্তি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী সূর্য প্রতাপ শাহী দেওরিয়াতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় দাবি করেছেন যে, গত ৯ বছরে রাজ্যের কৃষি ক্ষেত্রে এককথায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। তাঁর মতে, চাষাবাদ, সেচ, প্রযুক্তি এবং কৃষকদের আর্থিক সহায়তার দিক থেকে উত্তরপ্রদেশ আজ একটি নতুন কৃষি মডেল হিসেবে উঠে এসেছে।

কৃষিমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী, সরকারের নীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৃষকদের আয়, ফসল উৎপাদন এবং চাষের সুবিধার ওপর। তিনি বলেন, রাজ্য তৈরির পর যতগুলো সরকার এসেছে, তাদের মধ্যে বর্তমান সরকারের পারফরম্যান্স কৃষকদের জন্য সবচেয়ে ভালো।

আইনশৃঙ্খলা থেকে কৃষি, সর্বত্র বদলের দাবি

কৃষিমন্ত্রী শাহী বলেন, ২০১৭ সালের আগে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে প্রচুর সমস্যা ছিল। তাঁর দাবি, সেই সময় কৃষকরা সার, বিদ্যুৎ এবং সেচের মতো প্রাথমিক সুবিধাগুলোও ঠিক সময়ে পেতেন না। সরকারিভাবে ফসল কেনা খুব সীমিত ছিল এবং বিশেষ করে আখ চাষিদের টাকা বছরের পর বছর ধরে বকেয়া থাকত। তিনি জানান, গত কয়েক বছরে এই ব্যবস্থাগুলো सुधारের জন্য বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার ফলে কৃষকরা স্বস্তি পেয়েছেন।

৮৬ লক্ষ কৃষকের ঋণ মকুব করার দাবি

কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে সরকার গড়ার পর মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে কৃষকদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর আওতায় প্রায় ৮৬ লক্ষ কৃষকের প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণ মকুব করা হয়। শাহীর মতে, এই প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছভাবে কার্যকর করা হয়েছিল। সরকারের উদ্দেশ্য শুধু আর্থিক সাহায্য দেওয়াই ছিল না, বরং কৃষকদের আর্থিক সংকট থেকে বের করে এনে নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেওয়াও ছিল।

সেচ ও চাষের সুবিধার বিস্তার

সরকার চাষের খরচ কমানো এবং উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সেচ ও অন্যান্য পরিকাঠামোর ওপরও জোর দিয়েছে। কৃষিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

  • কয়েক দশক ধরে খারাপ অবস্থায় পড়ে থাকা খালগুলো মেরামত করা হয়েছে।
  • অসম্পূর্ণ সেচ প্রকল্পগুলো শেষ করা হয়েছে।
  • ৩০ লক্ষ হেক্টরের বেশি জমিকে সেচের আওতায় আনা হয়েছে।
  • ৯২ হাজারেরও বেশি পিএম কুসুম সোলার পাম্প লাগানো হয়েছে।
  • এই পাম্পে কৃষকদের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে কৃষকরা সারা বছর সেচের সুবিধা পাচ্ছেন এবং বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতাও কমেছে।

বিদ্যুতের বিল মকুব এবং আখের দাম পরিশোধ

কৃষিমন্ত্রী জানান, রাজ্যের প্রায় ১৬ লক্ষ কৃষকের টিউবওয়েলের বিদ্যুতের বিল মকুব করা হয়েছে। এছাড়া, সরকার প্রায় ৩৬০০ কোটি টাকার বিদ্যুতের বিল বহন করছে। আখ চাষিদের বিষয়ে তিনি বলেন, আগে যেখানে বছরের পর বছর টাকা আটকে থাকত, সেখানে এখন পর্যন্ত ৩ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি আখের দাম মেটানো হয়েছে। পাশাপাশি, আখের দাম প্রতি কুইন্টাল ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০০ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে।

কিষাণ সম্মান নিধির টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে

কৃষিমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় সরকারের 'প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি' যোজনার আওতায় উত্তরপ্রদেশের ৩ কোটিরও বেশি কৃষক নথিভুক্ত হয়েছেন। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৯৯,৫০০ কোটি টাকা সরাসরি কৃষকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে। ডিবিটি সিস্টেমের কারণে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা কোনও দালাল ছাড়াই সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

ফসল বিমায় সংকটে পাশে সরকার

প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কৃষকদের বাঁচাতে 'প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা'-র মাধ্যমেও সাহায্য করা হচ্ছে। কৃষিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:

  • গত ৯ বছরে ৬৭ লক্ষ ৫২ হাজার কৃষক বিমার সুবিধা পেয়েছেন।
  • মোট ৫৬৬০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
  • এই বছর খরিফ মরসুমে ৫.৩৯ লক্ষ কৃষককে ৫৩২ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
  • মার্চের শেষ নাগাদ আরও প্রায় ১৭০ কোটি টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

খাদ্যশস্য উৎপাদনে রেকর্ড বৃদ্ধি

সরকারের দাবি, গত কয়েক বছরে কৃষি উৎপাদনেও ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী:

  • ২০১৭ সালে খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল – ৫৪৭ লক্ষ মেট্রিক টন।
  • ২০২৪-২৫ সালে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে – ৭৩৭ লক্ষ মেট্রিক টন।

এর সঙ্গেই উত্তরপ্রদেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে দেশের অন্যতম সেরা রাজ্য হয়ে উঠেছে। দুধ, আম, গম, ধান এবং আখ উৎপাদনেও রাজ্য দেশের শীর্ষস্থানে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

চাষে প্রযুক্তি ও নতুন প্রতিষ্ঠান

কৃষিমন্ত্রী শাহী বলেন, চাষাবাদকে আধুনিক করতে নতুন প্রযুক্তির ওপরও কাজ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি, ড্রোন প্রযুক্তি এবং কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। সরকারের তথ্য অনুযায়ী:

  • ২০টি নতুন কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
  • কুশীনগরে একটি নতুন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে।
  • রাজ্যে কৃষক কল্যাণ কেন্দ্রও তৈরি করা হচ্ছে।
  • অনেক জেলায় কৃষকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কৃষিই এখন ইউপি-র অর্থনীতির ভিত

কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য, গত ৯ বছরে উত্তরপ্রদেশের কৃষি ব্যবস্থায় বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন এসেছে। উৎপাদন, প্রযুক্তি, সেচ এবং আর্থিক সহায়তার কারণে কৃষকদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তাঁর মতে, কৃষি ক্ষেত্র এখন শুধু কর্মসংস্থানের মাধ্যম নয়, বরং রাজ্যের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠছে।