শমিকা মাইতি, প্রতিনিধি, তাঁর আমলে নাকি এক কোটি কর্মসংস্থান হয়েছে- বিধানসভা ভোটের প্রচারে বেরিয়ে এই কথাটা বারবার বলছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার সেই দাবি যে কতটা অসার, ভিন্‌ রাজ্যে পড়ে থাকা বাংলার যুবসমাজই জানে। কাজের আশায় ভিটেমাটি, পরিবার-পরিজন ছেড়ে পাঁচশো-হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে কেউ ব্যাঙ্গালোর, কেউ হায়দরাবাদে দিন গুজরান করছে কোনও রকমে। এমনকী দরিদ্র পরিবারের স্কুলছুট ছেলেরাও ফুলের কাজ, রঙের কাজ করতে পাড়ি দিচ্ছে মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, মহারাষ্ট্রে। এই প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে কর্মসংস্থানকে অন্যতম ইস্যু করেছে বিজেপি। বাংলায় ‘আসল পরিবর্তন’ আনতে শিল্পায়নকে পাখির চোখ করেছে তারা।
এটা ঠিক, কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিল্পায়নের যোগ নিবিড়। কলকারখানা না থাকলে কাজ হবে কোথায়? গত দশ বছরে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনও বিনিয়োগ হয়নি। উল্টে জেসপ, হিন্দুস্তান মোটরস বা ডানলপের মতো ধুঁকতে থাকা কলকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বন্ধ হয়ে গিয়েছে বহু চটকল। মমতাকে কটাক্ষ করে রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘খেলা, মেলা উদ্বোধন করে বেড়ান উনি। কিন্তু কখনও দেখেছেন কারখানার উদ্বোধন করতে? এ রাজ্যে জমি পড়ে থাকা সত্ত্বেও কারখানা হচ্ছে না।’ দিলীপের মতে, সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা করতে দেওয়া হলে শিল্পায়নের যে পরিবেশ তৈরি হত, তাতে অনেক নতুন নতুন কলকারখানা খুলত। বস্তুত সিঙ্গুরের লোকজনও এখন সেটাই মনে করে। বিধানসভা ভোটের আগে তাই মমতা সিঙ্গুরে ১৯ একর জমির উপরে অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরির ঘোষণা করেছেন। 


সিঙ্গুরের মতো নন্দীগ্রামেও লোকজন এখন মনে করছেন, জমি ধরে রাখার জন্য আন্দোলন না করে কারখানা বানাতে দিলে ভাল হত। গত কয়েক বছরে কয়েক হাজার একর ধান জমি মাছের ভেড়ির জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে নন্দীগ্রামে। কারণ, জমিতে চাষ করে সংসার চলে না। তার চেয়ে ভেড়ি বানিয়ে মাছ চাষ করলে লাভ। কারখানা হলে আরও লাভ হত। বাড়ির পাশে কলকারখানাতে কাজ পেত এলাকার ছেলেমেয়েরা। ২০০৭-০৮’এ নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় ধান জমিতে কারখানা হতে দেবেন না বলে আন্দোলন করেছিলেন যাঁরা, তাঁদের অনেকের গলাতেই আজ তাই আক্ষেপের সুর।
বস্তুত, নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরের জমি আন্দোলন শুধু ওই এলাকার নয়, পুরো রাজ্যেই শিল্পায়নের পিছুটান হয়ে রয়ে গিয়েছে। যেহেতু ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতায় আসার ভিত্তি ছিল এই দুই আন্দোলন, তাই প্রথম থেকেই মুখ্যমন্ত্রী একটা বিষয়ে পরিষ্কার ছিলেন যে, জোর করে জমি অধিগ্রহণ করবেন না। মুশকিল হল বামেদের সৌজন্যে এ রাজ্যে জমির মালিকানা বহু খণ্ডিত। তাই একটা বড় শিল্প করতে এক লপ্তে যতটা জমির দরকার, তা পাওয়া কঠিন। একটা হিসাব দেখলে এই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগম থেকে মমতার জমানায় (গত ১০ বছরে) মোট ৯৪টি সংস্থাকে ১,৮৫৫.৫ একর জমি দেওয়া হয়েছে। আর পশ্চিমবঙ্গ শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়ন নিগমের থেকে দশ বছরে ৪৮৯টি সংস্থা পেয়েছে ১,৬২৩ একর। অর্থাৎ ৫৮৩টি সংস্থার নেওয়া গড় জমি ৫.৯ একর। এতটুকু জমিতে বড় শিল্প করা কঠিন। এই ভাবে জমি-জট আজও এই রাজ্যে শিল্পায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


বামজমানার বন্‌ধ, হরতালের রাজনীতি এই রাজ্যের ভাবমূর্তির যা ক্ষতি করেছে, তা মেরামত করা এমনিতেই কঠিন। তার উপরে রয়েছে তৃণমূল জমানার তোলাবাজি আর সিন্ডিকেটের দাপট। শিল্পদ্যোগীদের কথায়, লগ্নির ছাড়পত্র পেতে ‘দক্ষিণা’র রেওয়ার সর্বত্র রয়েছে। কিন্তু এ রাজ্যে তৃণমূলের জমানায় সমস্যা হল, কোথায় টাকা দিলে কাজ হয়ে যাবে তা নিশ্চিত নয়। বড়-মেজো-সেজো, অনেক দাদা। সবাইকে আলাদা করে খুশি করতে হবে। তারপরেও ছোটদাদা এসে ব্যাগড়া দেবে কাজে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার নুরপুরে আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কারখানায় যেভাবে হামলা চালিয়ে কাজ বন্ধ করে দিযেছিল একদল দুষ্কৃতী।

মমতার পাখির চোখ নন্দীগ্রামে জোর জনসংযোগ, শুভেন্দুকে হারাতে ২ দিনে ঠাসা প্রচারসূচি ..

অমিত শাহ মাইন্ড গেম খেলছেন বলল তৃণমূল, নন্দীগ্রামে মমতার প্রশ্ন উনি কি EVM দেখেছেন ...
এই সব কারণে শিল্প সম্মেলনের মঞ্চে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লগ্নির প্রস্তাব এলেও সেই অনুপাতে শিল্পায়ন হয়নি গত দশ বছরে। ২০১৫ সালে শিল্প সম্মেলনে ২,৪৩,১০০ কোটি টাকার প্রস্তাব এলেও বাস্তবে মাত্র ৯৮৩ কোটি টাকা লগ্নি হয়েছিল। ২০১৬-তে সেই অনুপাতটা যথাক্রমে ২,৫০,২৫৩ ও ৩,৪৩৩। ২০১৭-তে ২,৩৫,২৯০ ও ২,৫৩৬। ২০১৮-তে ২,১৯,৯২৫ ও ৬৫৫০। ২০১৯-ও ২,৮৪,২৮৮ ও ২,৩৬১। ২০২০ সালে সম্মেলন না হলেও ৮১৭ কোটি টাকার লগ্নি এসেছে। সেই তুলনায় ছোট ও মাঝারি শিল্পে লগ্নি এসেছে অনেক বেশি। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে টিসিএসের পর উইপ্রো, ইনফোসিস নতুন ক্যাম্পাস বানাচ্ছে। পাশাপাশি অশোকনগরে তেল, পাচামির নতুন কারখানা, অ্যামাজন, ফ্লিপকার্টের মতো সংস্থার লগ্নি- সব মিলিয়ে আগামী দিনে রাজ্যে কর্মসংস্থানের ছবি আরও উজ্জ্বল হতে চলেছে বলে দাবি তৃণমূল নেতৃত্বের।
কিন্তু শুধুমাত্র লগ্নি আনলেই হয় না, সরকারকে শিল্পস্থাপনের জন্য অনুকূল পরিবেশও তৈরি করে দিতে হয়। এর মধ্যে রাস্তাঘাট, বিদ্যুতের মতো পরিকাঠামোর কাজ যেমন পড়ে, তেমনই  আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিও থাকে। এই রাজ্যে লগ্নিকারীদের অভিযোগ, সাহায্য তো দূর শাসকদলের লোকেরা দাদাগিরি করে কাজ বন্ধ করে দেয়। তোলাবাজি আর সিন্ডিকেটের দাপটে কোনও কাজ করা কঠিন এই রাজ্যে। মাসখানেক আগেই সিন্ডিকেট ও তোলাবাজদের দৌরাত্ম্য নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সরাসরি অভিযোগ জানিয়েছিলেন নর্থবেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের কর্তারা। তাঁদের অভিযোগ, গত এক বছরে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি জেলার অন্তত দশটি জায়গায় কারখানা করতে গিয়ে সিন্ডিকেট ও তোলাবাজদের বাধার মুখে পড়েছেন লগ্নিকারীরা। বিভিন্ন শিল্পের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সামলাতেও তৃণমূল সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে মনে করে শিল্পমহল। রাজ্যের শ্রমমূল্য নিয়েও ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।    
বস্তুত, কর্মসংস্থানের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গে বড় সমস্যা শ্রমমূল্যের। এই রাজ্যে কাজের সংস্থান থাকলেও বেতন খুবই কম। সে সংগঠিত ক্ষেত্রে হোক বা অসংগঠিত ক্ষেত্রে।   যেমন চটশিল্পের কথা ধরা যাক। শ্রমনিবিড় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ। গড়ে এক জন অতিদক্ষ স্থায়ী শ্রমিকের বেতন দৈনিক ৫৩৭ টাকা। অস্থায়ী অদক্ষ শ্রমিকের বেতন ৩৭০ টাকা থেকে শুরু। ভিন্‌ রাজ্যে সেখানে অস্থায়ী শ্রমিকদের বেতন ন্যূনতম ৬০০ টাকা। কেরল, মহারাষ্ট্রে দিনমজুরি করেও যে টাকা পাওয়া যায়, এ রাজ্যে চটকলে দক্ষ শ্রমিকেরা তা পান না। পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদার বাসিন্দা চন্দন জানা পুনেতে কাজের খোঁজে এসেছিলেন বছর পনেরো আগে। প্লাস্টিক কারখানার অদক্ষ কর্মী চন্দনের কথায়, ‘২৫ হাজার টাকা বেতন। ওভারটাইম করে ৩০ হাজার হয়ে যায়। বেলতা তো দূর, কলকাতাতেও এত টাকা কেউ দেবে না।’ বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত শিক্ষিত যুবকরাও একই কথা বলছেন, মুম্বই বা দিল্লির মতো শহরে একই কাজের জন্য যে বেতন পাওয়া যায়, এ রাজ্যে তার অর্ধেক মেলে।


অর্থাৎ বিজেপি ক্ষমতায় এলে শুধু শিল্পে বিনিয়োগ আনলেই হবে না, তার সঙ্গে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট-রাজ যাতে শিল্পের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, শিল্পের অনুকূল পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, শ্রমের যথাযথ মূল্য যাতে মেলে সেদিকে নজর দিতে হবে। তবেই শিল্প-বাণিজ্যে মাথা তুলে দাঁড়াবে ‘সোনার বাংলা’। আসবে বাঙালির অতিকাঙ্খিত ‘আসল পরিবর্তন’।