একটা সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজনদের তালিকায় অন্যতম নাম ছিল দীনেশ ত্রিবেদী। মুকুল রায়কে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের সেনাপতি বলা হয় তবে দীনেশ ত্রিবেদীকে সহসেনাপতি বললে খুব একটা ভুল হবে না। কারণ মুখ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তিনি দিল্লিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু রেলভাড়াকে কেন্দ্র করে তাঁর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। আর সেইকারণে তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল রেলমন্ত্রীর মত গুরুত্বপূর্ণ পদ। তাঁর পরিবর্তে সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছিলেন মুকুল রায়কে। সেই সবই আজ ইতিহাস। গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। রাজ্য তথা দেশ রাজনীতিতেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। 

দীনেশের ইস্তফা 
মুকুল রায় অনেক দিন আগেই তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়েছেন। তারপর একে একে দল ছেড়েছেন শুভেন্দু অধীকারী, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। শুক্রবার আচমকাই তিনি রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে  ইস্তফা দেন। তারপর থেকে জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে  তিনিও কী বিজেপিতে যাচ্ছেন? যদিও এই প্রশ্নের উত্তর দেননি দীনেশ ত্রিবেদী। কিন্তু রাজ্য বিজেপির প্রথম সারির নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন গেরুয়া শিবিরে। 
 
গুজরাত যোগ 
পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ দিনের বাসিন্দা হলেও গুজরাতের সঙ্গে নিবীড় যোগ রয়েছে দীনেশ ত্রিবেদীর। গুজরাতি দম্পতি হীরালাল ও ও উর্মিলার কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। কলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের পড়ুয়া। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ ডিগ্রি রয়েছে তাঁর পকেটে। সেইসঙ্গে রয়েছে পাইলট হওয়ার প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেটও। একটা সময় কলকাতায় বিমান পরিষেবার ব্যবসাও শুরু করেছিলেন তিনি। রাজনীতি করলেও দীনেশ ত্রিবেদীর রক্তে রয়েছে ব্যবসায়। গুজরাতে বেশ কয়েকটি ব্যবসা রয়েছে তাঁর পরিবারের।  

রাজনীতির শুরু 
রাজনীতির হাতেখড়ি কংগ্রেস। ১৯৮০ সালে কংগ্রেসে নাম লেখালেও পরবর্তীকালে জনতা দলে যোগ দিয়েছিলেন দীনেশ ত্রিবেদী। ১৯৯৯ সাল থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী ছিলেন। তিনি ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সাধারণ সম্পাদক। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সালে জনতা দল ইউনাইটেডের হয়ে গুজরাত থেকে রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন তিনি। ২০০২-২০০৮ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে রাজ্যসভায় গিয়েছিলেন তিনি। বর্ণময় সাংসদ জীবনে একাধিক সম্মান পেয়েছেন তিনি। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটেই লোকসভার সদস্য হয়েছিলেন তিনি।  ২০১৬ -১৭ সালে শ্রেষ্ঠ সাংসদের পুরষ্কারও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে ব্যারাকপুর কেন্দ্রে একসময়ের দলীয় সবকর্মী অর্জুন সিং-এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় হেরে যান দীনেশ ত্রিবেদী। তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে গিয়ে জয়ী হয়েছিলেন অর্জুন সিং। 

রাজনৈতিক বিবাদ 
২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন দীনেশ ত্রিবেদী। ২০১১ সালে এই রাজ্যে পালা বদলের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেল মন্ত্রত্ব ছেড়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এই রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় তিনি দীনেশ ত্রিবেদীকে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে দেন। তবে একটি রেল বাজেটও পেশ করেন তিনি। যা রীতিমত প্রশংসা করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী  মনমোহন সিং। কিন্তু রেল ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর বিবাদ শুরু হয়েছ। তাতেই রেলমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন দীনেশ। সেই পদে বসেছিলেন মুকুল রায়। সেই সময় দীনেশ ত্রিবেদী একটাই কথা বলেছিলেন তা হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে পদ ছাড়তে বলেছিলেন বলেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া আর কোনও মন্তব্য করেননি। দল বা দলনেত্রী নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন সমালোচনা না করলেও দলের অন্দরের খবর রেল মন্ত্রীর পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পরই দূরত্ব বাড়তে থাকে মমতার সঙ্গে। দীনেশ ত্রিবেদী সম্পর্কে একটা গুঞ্জন শোনা যায়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই নাকি তিনি দল বদলের চেষ্টা করেছিলেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেও দল বদলের জল্পনা বেড়েছিল। সূত্রের খবর দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে ব্যারাকপুর কেন্দ্রের টিকিটের দাবি জানিয়েছিলেন অর্জুন সিংও। সেই সময় দলবদলের হুমকি দিয়েছিলেন দুজনেই। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীনেশকে খালি হাতে ফেরাননি। ভোটের দিন ব্যারাকপুর কেন্দ্র শিরোনামে উঠে এলেও শেষ হাসি হেসেছিলেন অর্জুন। তারপরই দীনেশকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিলেন মমতা। সূত্রের খবর রেল মন্ত্রক নিয়ে যে সম্পর্কে চিড় ধরেছিল তা মেরামত হয়নি পরবর্তীকালেও। 


গুঞ্জন

রাজধানীর রাজনীতিতে যথেষ্ট পরিচিত নাম দীনেশ ত্রিবেদী। ইতিমধ্যেই দীনেশ ত্রিবেদীকে স্বাগত জানিয়ে রেখেছে বিজেপি। রাজধানীর অন্দরে জল্পনা দীনেশ ত্রিবেদীকে গুজরাট থেকে রাজ্যসভা নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে বিজেপির। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেখা যেতে পারে।