বাংলায় গরম যত বাড়ছে, ততই চড়ছে রাজনীতির পারদও। বৃহস্পতিবার পুরুলিয়ায় সভা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আসন্ন নির্বাচনেও তিনিই বিজেপির সবথেকে বড় মাপের তারকা প্রচারক। তাঁর বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের সবচেয়ে বড় অভিযোগ, তিনি 'বহিরাগত'। বাংলার শিল্প সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণাই নেই। নির্বাচনের জন্য তিনি বাংলা বলার চেষ্টা করছেন, এমনকী তাঁর চুল-দাড়ি বড় করা নিয়েও কটাক্ষ  করা হয়েছে। সত্য়িই কি বাংলায় বহিরাগত মোদী?

এদিনের সভাতেও নরেন্দ্র মোদীকে বাংলায় কথা বলতে শোনা গিয়েছে। তিনি বলেন, দিদি বলছেন, 'খেলা হবে। বিজেপি বলছে, বিকাশ হবে'। উচ্চারণে একটু ভুল হলেও গত কয়েক মাসে বারবারই তাঁর মুখে বাংলা উচ্চারণ শোনা গিয়েছে। গত বছর মহাষষ্ঠীর দিন তিনি দুর্গা পূজা উপলক্ষ্যে বংলার মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একেবারে খাঁটি বাংলায় বলেছিলেন, 'প্রথমেই আপনাদের সকলকে জানাই শ্রীশ্রী দুর্গাপুজো এবং কালীপুজোর প্রীতি ও শুভেছা। বাংলার ​পবিত্র ভূমিতে দুর্গাপুজোর সময় আপনাদের সকলের মধ্যে আসতে পেরে আজ আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।'

কিন্তু, নরেন্দ্র মোদী শুধু পশ্চিমবঙ্গে এসে বাংলা বলছেন, তা নয়। তিনিযখনই যে রাজ্যে বা যে দেশে সফরে যান, সেখানে স্থানীয়দের সঙ্গে সংযোগের জন্য স্থানীয় ভাষা বলার চেষ্টা করেন। ২০১৯ সালে আমেরিকার হিউস্টনে 'হাউডি, মোদী' অনুষ্ঠানেও বাংলা-সহ বেশ কয়েকটি ভারতীয় ভাষায় প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন 'ভারতে সব খুব ভাল'। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বারাণসীতে শ্রী জগদগুরু বিশ্বাচার্য গুরুকুলের শতবর্ষ উদযাপনের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী, কন্নড়, তেলেগু, মারাঠি এবং হিন্দি - চারটি চারটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলেছিলেন। এমনকী জাপানের প্রধানমন্ত্রী, অস্ট্রেলিয় প্রধানমন্ত্রী, ইস্রায়েলের প্রধানমন্ত্রীদের মতো বিশ্বনেতাদের সঙ্গেও স্থানীয় ভাষায় টুইট করতে দেখা যায়।

বাংলায় কথা বলার সময়, নরেন্দ্র মোদী প্রায়শই রামকৃষ্ণ পরমহংস, গণিতবিদ রাধানাথ শিকদার, দার্শনিক ভূদেব মুখোপাধ্যায়, ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামী বাঙালি আইকন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ বাংলার গর্বের সন্তানদের কথা উল্লেখ করেন। তবে, এটাও শুধুমাত্র বাংলার ক্ষেত্রে তিনি করে থাকেন তা নয়। প্রধানমন্ত্রীকে দেখা যায় সকল ভাষার কৃতীদের সম্মান জানানোর চেষ্টা করতে। ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর গুজরাতের কেভাদিয়ায় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় ঐক্য দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানের সময় যেমন প্রধানমন্ত্রী মোদী তামিল ভাষায়, সেই ভাষার কিংবদন্তী কবি সুব্রমনিয়ম ভারতীর লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।

আরও পড়ুন - নকশাল দূর্গ ঝাড়গ্রাম এখন বিজেপির ঘাঁটি, কীভাবে জমি তৈরি করে দিয়েছে আরএসএস, দেখুন

আরও পড়ুন - 'ধর্ম'-যুদ্ধ, বিজেপির চক্রবূহে ফেঁসে গিয়েছেন মমতা - এবার দুই কূলই না হারাতে হয়

আরও পড়ুন - নামকরণ, অনুকরণ এবং নাকচ - কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি নিয়ে কোন খেলায় মেতেছেন মমতা, দেখুন

তাঁর এই সব বক্তৃতা জনসভায় সমর্থকদের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলে ঠিকই, কিনতু এটাই বাংলায় সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর একমাত্র সংযোগ নয়। বস্তুত, মাত্র ১৭ বছর বয়সেই প্রথমবার বাংলায় পা পড়েছিল তাঁর। সেই সময় তিনি ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েছিলেন দেশভ্রমণে। কলকাতার বেলুড় মঠে এসে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। সন্ন্যাস নিতে চাইলেও রামকৃষ্ট মিশনের তৎকালীন সভাপতি স্বামী মাধবানন্দজী তিন-তিনবার প্রত্যাখান করেছিলেন মোদীকে।

অবশেষে, ১৯৯৬ সালে রামকৃষ্ণ মিশনের রাজকোট শাখার প্রধান স্বামী আত্মাস্থানন্দজির সান্নিধ্যে এসেছিলেন তিনি। তাঁকে স্বামীজি ও রামকৃষ্ণ ঠাকুরের শিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন স্বামী আত্মাস্থানন্দজি। আর সেই শিক্ষা তাঁর জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলেছিলেন বলে নিজেই জানিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। ২০১৫ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথম বাংলা সফরে এসেই তিনি বেলুড় মঠ এবং দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরে  গিয়েছিলেনষ হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থ স্বামী আত্মাস্থানন্দজি মহারাজের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন।

রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের শিক্ষা যাঁর জীবন বদলে দিয়েছিল, সেই মোদীকে কি সত্যিই বাংলায় বহিরাগত বলা যায়? এই দুই মহাপুরুষের দর্শনই তো চিরন্তন বাংলা দর্শন।