তপন মল্লিক: বিধানসভা নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই তাঁকে ঘিরে চর্চা শুরু হয়েছিল। ভোট এগিয়ে আসায় শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে চলা জল্পনা-কল্পনা তুঙ্গে উঠেছে। তবে শুভেন্দু তাঁর দলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও নিজের মুখে কখনো দল ছাড়া বা বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কথা স্পষ্ট করে বলেননি। শুভেন্দুর তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান নিয়ে গেরুয়া শিবির অবশ্য কোনও জল্পনার অবকাশ রাখতে চায়নি। প্রথম থেকেই তারা একেবারে নিশ্চিত করে বলে গিয়েছে, শুভেন্দু বিজেপিতেই যোগ দেবেন।

প্রসঙ্গত, শুভেন্দুর সঙ্গে তৃণমূলের ছাড়াছাড়ি ঘটছে ধাপে ধাপে। গত ২৫ নভেম্বর প্রথমে তিনি হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেন। তার দু'দিন পর তিনি তৃণমূল সরকারের মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেন। বুধবার (১৬ ডিসেম্বর) শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদটিও ছেড়ে দিয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে খবর, বিজেপিতে  তাঁর যোগ দেওয়ার এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। জনা গিয়েছে তিনি নাকি ১৭ ডিসেম্বরই দিল্লি যাচ্ছেন। তার পরের দিন  অর্থাৎ শনিবার (১৮ ডিসেম্বর) তাঁর নিজের গড় পূর্ব মেদিনীপুরে অমিত শাহের উপস্থিতিতেই বিজেপিতে যোগ দেবেন শুভেন্দু অধিকারী। ইতিমধ্যেই শুভেন্দুর অনুগামীদের একের পর এক কার্যালয় গেরুয়া রং-এ সেজে উঠেছে।

আরও পড়ুন - ভারতে আর চলবে না চিনা নজরদারি, টেলিকমে সুরক্ষা বাড়াতে বিরাট সিদ্ধান্ত মোদী সরকারের

আরও পড়ুন - বাবা জেলবন্দি, পালিয়েছে মা - ফুটপাতে নেমে আসা কিশোরকে ছেড়ে যায়নি শুধু পোষ্য কুকুর

আরও পড়ুন - 'ডান্স মহামারি'-র কথা শুনেছেন কখনও, আক্রান্তরা এত বেশি নাচে যে শেষে তাদের মৃত্যু হয়

সেইসঙ্গে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে খবর, শুভেন্দু অধিকারীর জন্য কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা এবং বুলেট প্রুফ গাড়ি দেওয়া হবে। মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঠিক আগেই শুভেন্দু  রাজ্য সরকারের জেড প্লাস ক্যাটিগরির নিরাপত্তা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তৃণমূল নেতা মুকুল রায় যখন ঘাসফুল দল ছেড়ে পদ্ম শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন, তখন তিনিও রাজ্যের নিরাপত্তা ছেড়ে দিয়েছিলেন, আর তার পরই তাঁকে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল। তাই শুভেন্দুর কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ার বিষয়টা তাঁর বিজেপিতে যোগদানের নিশ্চয়তা হিসাবেই দেখা হচ্ছে। শুভেন্দুও, মুকুল রায়ের পথেই গেরুয়া শিবিরের দিকে এগিয়ে চলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত শুভেন্দু অধিকারী, নিজের মুখে তৃণমূল দল ছাড়া বা বিজেপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে একটি কথাও কথা বলেননি।

বেশ কিছুদিন ধরেই তৃণমূলের ব্যানার বা নেত্রীর ছবি ছাড়াই নন্দীগ্রামের বিধায়ককে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে। 'দাদার অনুগামী' লেখা ব্যানারও বহু জেলায় চোখে পড়েছে। তৃণমূলের নেতারা তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুললে  যখন শুভেন্দুও পাল্টা জবাব দিতে ছাড়েননি। এই অবস্থায় ডিসেম্বরের প্রথম দিন সৌগত রায়ের মধ্যস্থতায় শুভেন্দুর সঙ্গে বৈঠক  করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রশান্ত কিশোর। সৌগত রায় নিজেই জানান, বৈঠক ইতিবাচক, সমস্ত জটিলতা কেটে গিয়েছে, শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলেই থাকছেন। কিন্তু রাত পার হতেই তাল কেটে যায়। শুভেন্দু সৌগত রায়কে জানান, যে তাঁরা বৈঠকের শর্ত মানেননি, তাই আর একসঙ্গে পথ চলা সম্ভব নয়।

মুকুল রায় বিজেপিতে গিয়ে দীর্ঘদিন সেরকম পাত্তা পাননি। গুরুত্ব না পাওয়ার কারণে তাঁর বিজেপি ছাড়া নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে মুকুলের সঙ্গে শুভেন্দুর অনেক ফারাক। শুভেন্দু অধিকারী, মমতা না হলেও এই রাজ্যে তিনিও যথেষ্ট জনপ্রিয়। অন্তত বেশ কয়েকটি জেলায় তাঁর অনুগামীর সংখ্যা প্রচুর। অন্যদিকে বিজেপিতে এখন পর্যন্ত এমন একটিও মুখ নেই, যিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েটের বিরুদ্ধে বিকল্প হতে পারেন। ফলে বিজেপি যে শুভেন্দুকে চাইবে এবং তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প হিসেবে সেকথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে নিজের দলে শুভেন্দু এই মুহুর্তে স্বয়ং নেত্রীরও চক্ষুশূল। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরলে এবং ভোটের লড়াইয়ে শুভেন্দু ভাল কাজ করে দেখালেও যে, নেত্রী তাঁকে ফের আগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন, তেমনটাও নয়। আর তৃণমূলে থেকে শুভেন্দুর পক্ষে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হওয়া সম্ভব নয় কখনই। কেননা সেখানে আছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেক্ষেত্রে শুভেন্দুর পক্ষে এই মুহুর্তে উপযুক্ত স্থান হতে পারে বিজেপি। শুভেন্দুকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হতে গেলে বিজেপির মতো চ্যালেঞ্জার পার্টিকেই দরকার। কংগ্রেস তাঁর কাছে বিকল্প হতে পারত, কিন্তু কংগ্রেসের সেই ক্ষমতা নেই বাংলায়। তাই শুভেন্দু হয়ত বিজেপিকেই বেছে নেবেন।