সকালে মহালক্ষ্মীকে শক্তিরূপে পুজো করা হয়। অন্যদিকে, রাতে কোজাগরী লক্ষ্মীরূপে চলে আরাধনা। অর্থাৎ, একই দেবীর মধ্যে শক্তি ও সমৃদ্ধির দুই ভাবনাকে সামনে রেখে পুজোর আয়োজন করা হয়।
মালদা: দশভুজা বলতেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে দেবী দুর্গার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু মা লক্ষ্মীরও যে ১৮টি হাত থাকতে পারে, তা অনেকের কাছেই অজানা। দেবীর সেই ব্যতিক্রমী রূপেরই দেখা মেলে মালদার বামনগোলা ব্লকের গাঙ্গুরিয়ায়। এখানকার শ্রীশ্রী সারদা তীর্থ আশ্রমে গত ২৬ বছর ধরে নিষ্ঠা ও প্রাচীন রীতিনীতি মেনে পূজিত হয়ে আসছেন ১৮ হাতবিশিষ্ট মহালক্ষ্মী। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোকে কেন্দ্র করে এই আশ্রমে ভক্তদের সমাগমও হয় চোখে পড়ার মতো।
২০০০ সাল থেকে শুরু বিশেষ পুজো
আশ্রম কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীশ্রী সারদা তীর্থ আশ্রম। তার দু’বছর পর, অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকে সেখানে শুরু হয় ১৮ হাতবিশিষ্ট মহালক্ষ্মীর আরাধনা। সেই থেকে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এই বিশেষ পুজো। প্রচলিত লক্ষ্মীপ্রতিমার সঙ্গে এই দেবীমূর্তির পার্থক্য যেমন নজর কাড়ে, তেমনই দেবীর শক্তিরূপের ভাবনাও এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ।

দেবীর ১৮ হাতে অস্ত্র, শক্তির প্রতীক মহালক্ষ্মী
দেবীর ১৮টি হাতে রয়েছে চক্র, ত্রিশূল, গদা, তির-ধনুক, বজ্র, কুঠার, পদ্ম ও শঙ্খ-সহ বিভিন্ন অস্ত্র এবং প্রতীক। অসুরবিনাশিনী শক্তিরূপে দেবীকে কল্পনা করেই এখানে তাঁর আরাধনা করা হয়। আশ্রম কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দেবীর এই রূপে লক্ষ্মী, দুর্গা ও চণ্ডীর বিভিন্ন ভাবনার সমন্বয় ঘটেছে। ফলে সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মী এখানে একই সঙ্গে শক্তি ও অশুভ বিনাশের প্রতীক।
সকালে শক্তিরূপে, রাতে কোজাগরী লক্ষ্মী
এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব হল দেবীর আরাধনার ধরন। সকালে মহালক্ষ্মীকে শক্তিরূপে পুজো করা হয়। অন্যদিকে, রাতে কোজাগরী লক্ষ্মীরূপে চলে আরাধনা। অর্থাৎ, একই দেবীর মধ্যে শক্তি ও সমৃদ্ধির দুই ভাবনাকে সামনে রেখে পুজোর আয়োজন করা হয়। এই স্বতন্ত্র রীতিই গাঙ্গুরিয়ার সারদা তীর্থ আশ্রমের মহালক্ষ্মীপুজোকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

১৬ উপাচার, ১০৮ বেলপাতায় যজ্ঞ
কোজাগরী পূর্ণিমা উপলক্ষে আশ্রমে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। ১৬ রকম উপাচারে দেবীর পুজো করা হয়। পাশাপাশি যজ্ঞে অর্পণ করা হয় ১০৮টি বেলপাতা। দেবীর উদ্দেশে নিবেদিত ভোগেও থাকে বিশেষ আয়োজন। পাঁচ রকমের ভাজা, তিন রকমের তরকারি, ডাল ও মিষ্টি দিয়ে সাজানো হয় ভোগের থালা। রাতের পুজোয় চিত্রপটেও মহালক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়।
২৬ বছরের ঐতিহ্যে ভক্তদের সমাগম
আশ্রমের স্বামী আত্মাপ্রেনানন্দ মহারাজ জানান, ২০০০ সালে এই বিশেষ পুজো শুরু হওয়ার পর থেকে নিয়ম মেনে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। প্রতি বছর এই ব্যতিক্রমী মহালক্ষ্মীর দর্শন করতে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন। পুজো শেষে তাঁদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণেরও ব্যবস্থা থাকে। সময়ের সঙ্গে এই পুজো স্থানীয় মানুষের কাছে ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি এক বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। মালদার বামনগোলার গাঙ্গুরিয়ায় তাই ১৮ হাতবিশিষ্ট মহালক্ষ্মীর আরাধনা শুধু পুজো নয়, ২৬ বছরের বিশ্বাস, ভক্তি ও ঐতিহ্যেরও এক অনন্য নিদর্শন।


