বিশ্ব হেরিটেজের তালিকাভুক্ত জলা-জমি বোজানোর চেষ্টা। আর তাতেই নাম জড়াল তৃণমূল পঞ্চায়েত প্রধানের। এই ঘটনায় নরেন্দ্রপুর পুলিশ ৩ জনকে গ্রেফতারও করেছে। অভিযোগ এরা জেসিবি মেশিন দিয়ে খালের মধ্যে মাটি ফেলে ভরাট করছিল। ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত খেয়াদা ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের মৌলিহাটিতে এই খাল বোজানোর চেষ্টা চলছিল বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় শুধু তৃণমূল গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান গোরাচাঁদ নস্করের নামই জড়ায়নি, সেইসঙ্গে সেন্ট স্টিফেন্স স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও বেআইনিভাবে খাল বোঝানোর অভিযোগে সরব হয়েছেন বেশকিছু মানুষ। যদিও, সমস্ত অভিযোগ-ই অস্বীকার করেছে সেন্ট স্টিফেন্স। 

আরও পড়ুন- নেই কোনও স্থায়ী সেতু, আসে না অ্যাম্বুলেন্স, প্রতিবাদে পঞ্চায়েত নির্বাচন বয়কটের ডাক দিল গ্রামবাসীরা

দিন কয়েক আগেই সামনে আসে মৌলিহাটির এই জলা জমি বুঝিয়ে ফেলার ঘটনা। সূত্র মারফত বারুইপুরে পুলিশ সুপারের দফতরেও তা জানানো হয়। এরপরই ধরপাকড় শুরু করে নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ। ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে তিন জন শ্রমিককে পাওয়া যায়। হেরিটেজ জলা জমি নষ্ট করার অভিযোগে এবং বেআইনিভাবে খাল ভরাটের জন্য তাদের গ্রেফতার করে সোনারপুর থানায় নিয়ে আসা হয়। 

অভিযোগ, খেয়াদা এক নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান গোরাচাঁদ নস্কর-এর নেতৃত্বে এই খাল বোঝানোর কাজ চলছিল। তবে, তিনি সামনে থেকে এই কাজে অংশ নেননি। তাঁর তিন শাগরেদ সনৎ নস্কর, সত্য ঘোষ এবং অস্ট বিশ্বাস এই মাটি বোঝানোর কাজের বরাত নিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ। আরও অভিযোগ, খালে মাটি ফেলার জন্য এবং তাতে আপত্তি না জানানোর জন্য তৃণমূল প্রধান গোরাচাঁদ নস্করের সঙ্গে নাকি ২০ লক্ষ টাকার চুক্তি করা হয়েছিল। অভিযোগ, বেআইনিভাবে এই জলা জমি ভরাট করে সেখানে রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা করেছিল সেন্ট স্টিফেন্স স্কুল কর্তৃপক্ষ। বহু বছর আগে মৌলিহাটি-র এই স্থানে স্কুল গড়ার জন্য সরকারের কাছ থেকে নামমাত্র দামে ১১ বিঘা জমি পায় সেন্ট অগাস্টিন। কিন্তু, জমি-তে ঢোকার মুখে বড় বাধা হচ্ছে জলা জমি। এদিকে, ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খেয়াদা ১ নম্বর পঞ্চায়েতে জলা জমি ভরাটের উপরে নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু সমস্ত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই এই জলা জমি ভরাটের কাজ চলছিল বলে অভিযোগ। 

আরও পড়ুন- দেড় বছরের ঘুমন্ত মেয়েকে পুকুরে ফেলে দিলেন মা, বাঁকুড়ায় চরম নৃশংসতা

এশিয়ানেট নিউজ বাংলার পক্ষ থেকে অভিযুক্ত তৃণমূল গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান গোরাচাঁদ নস্করের সঙ্গে কথাও বলা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ উড়়িয়ে দিয়েছেন গোরাচাঁদ। উল্টে তিনি জলা জমি ভরাটের জন্য সেন্ট স্টিফেন্স স্কুল কর্তৃপক্ষের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, বারবার বারণ করার সত্ত্বেও সেন্ট স্টিফেন্স কর্তৃপক্ষ কথা শোনেনি। মাটি তুলে ফেলে যাতে জলা জমি-কে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য নাকি তিনি সেন্ট স্টিফেন্সকে নির্দেশ দিয়েছেন। 

আরও পড়ুন- অভিনব উপায়ে বাড়ির ছাদে মাছ চাষ করে খবরের শিরোনামে এই বিজ্ঞানী

সেন্ট স্টিফেন্সের পক্ষ থেকে প্রভাকর নামে এক ব্যক্তি গোরাচাঁদ নস্করের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। এই প্রভাকর-ই খেয়াদার মৌলিহাটি-তে সেন্ট অগাস্টিনের জমি-র বিষয়টি দেখাশোনা করেন। তিনি নিজের পুরো পরিচয় এবং ডেসিগনেশন জানাতে না চাইলেও এটা পরিস্কার যে মৌলিহাটিতে জলা জমি ভরাট করা হচ্ছিল। তবে, তিনি জানিয়েছেন, জলা জমি-র যে অংশে মাটি ফেলা হয়েছে তা স্কুলেরই জমির অংশ। জমি-তে নির্মাণ কাজ করার জন্য ব্রিজ তৈরি করার প্রক্রিয়া চলছে। কারণ, জমিতে নির্মাণকাজের কাঁচামাল নিয়ে যেতে হলে খালের উপর দিয়ে ব্রিজ হওয়াটা জরুরি। প্রভাকরের দাবি, ব্রিজ তৈরি হয়ে গেলেই মাটি সরিয়ে ফেলা হবে এবং জলা জমি-কে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে। যদিও, সাধারণ কিছু মানুষের অভিযোগ, সেন্ট স্টিফেন্সের হাত থেকে ওই জমি আগরওয়াল নামে এক ব্যবসায়ীর হাতে চলে গিয়েছে। এলাকার দুর্গমতা ও অনুন্নয়নের জন্য সেন্ট স্টিফেন্স ওখানে স্কুল তৈরি করবে না। অভিযোগ, জমি কেনার জন্য ব্রিজ বা রাস্তা তৈরির শর্ত রেখেছেন জনৈক ব্যবসায়ী আগরওয়াল। এই ব্রিজ বা রাস্তা সেন্ট স্টিফেন্স কর্তৃপক্ষকেই তৈরি করে দিতে হবে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এই জমি হস্তান্তরের জন্য-ই এখন খাল বোজানো হচ্ছিল বলেও দাবি করেছে নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সব মানুষরা। তাঁদের আশঙ্কা যে কোনও মুহূর্তেই গোরাচাঁদ নস্করের বাহিনীর হাতে তাঁরা আক্রান্ত হতে পারেন। 

বিষয়টি নিয়ে সোনারপুর উত্তর বিধানসভার বিধায়ক ফিরদৌসী বেগমকেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু, তিনি বিষয়টি কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন। পুলিশি ধরপাকড়ের কথা শুনে অবশ্য তাঁর বক্তব্য যে প্রশাসন কাজ করছে বলেই খাল বোজানোর অপচেষ্টা আটকে দেওয়া গিয়েছে। তৃণমূল প্রধানের নাম জড়িত থাকার ব্যাপারে কোনও মন্তব্য তিনি করতে রাজি হননি। ফোনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার তৃণমূল সভাপতি শুভাশিস চক্রবর্তীকেও ধরার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু, ফোনে নেটওয়ার্ক কভারেজ এলাকার বাইরে থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এমনকী, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি প্রবীর সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। ফোন বেজে গেলেও তিনি তা তোলেননি। সাধারণ মানুষ যারা বিশ্ব হেরিটেজের তালিকাভুক্ত জলা জমি-তে মাটি ফেলে ভরাটের বিরোধিতা করছেন তাঁরা এখনও আশঙ্কায় রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই কাণ্ডের মূল কুশীলবরা এখনও বহাল তবিয়েতে মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা উচিত বলেও দাবি করেছেন এরা।