২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে কোনও প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হওয়া একটি স্বল্প-পরিচিত রাজনৈতিক দল হঠাৎ করেই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ 'ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া' (Nationalist Citizens Party of India বা NCPI) নামের দলে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।

২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে কোনও প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হওয়া একটি স্বল্প-পরিচিত রাজনৈতিক দল হঠাৎ করেই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ 'ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া' (Nationalist Citizens Party of India বা NCPI) নামের দলে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তারপরেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাটি বাংলার একটি অখ্যাত দলকে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের এক গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং দলটির উৎপত্তি, গঠন, নেতৃত্ব ও অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতির দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

অল্প সময়ের ব্যবধানে বড় রাজনৈতিক গুরুত্ব পাওয়া একটি ছোট দল

ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে 'নিবন্ধিত কিন্তু অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল' (RUPP) হিসেবে NCPI-র নাম নথিভুক্ত করা হয়। বাংলায় নিবন্ধিত হওয়া সত্ত্বেও দলটি ত্রিপুরায় তাদের নির্বাচনী যাত্রা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, দলটি মোট ১.১৩ লক্ষ টাকা অনুদান পেয়েছিল। দলের নথিপত্র অনুযায়ী, শিউলি কুণ্ডু এর কোষাধ্যক্ষ। তিনি এই রাজনৈতিক দলের ঠিকানাতেই নিবন্ধিত আরও দুটি সংস্থার ডিরেক্টর। 'বিশ্ববাজার প্রাইভেট লিমিটেড' (নভেম্বর ২০২১ থেকে ডিরেক্টর) এবং 'পশ্চিমবঙ্গ অসংগঠিত মহিলা কর্মী অ্যাসোসিয়েশন' (অক্টোবর ২০২০ থেকে ডিরেক্টর), যা একটি সমাজসেবামূলক সংস্থা।

এই তিনটি সংস্থারই ঠিকানা হাওড়া জেলার বনিপুর এলাকায়। দলটির সভাপতি হলেন উত্তম কুণ্ডু, যিনি শিউলি কুণ্ডুর স্বামী। একটি ফেসবুক পোস্টে উত্তম কুণ্ডু শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে একটি ছবি শেয়ার করেছিলেন। এনসিপিআই (NCPI) নেতা শান্তনু দে জানিয়েছেন যে, ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াস অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (TTAADC) এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্য নিয়ে দলটি ত্রিপুরার রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিল।

দলটি সাতটি নির্বাচনী কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছিল। তবে চারটি আসনের প্রার্থীদের মনোনয়ন পত্র বাতিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত, এনসিপিআই-এর প্রার্থীরা দলের প্রতীকে মাত্র দুটি কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফলাফল ছিল নিম্নরূপ: চাউমানু (৫৩৬ ভোট) এবং কৈলাসহর (২৮৬ ভোট)। সব মিলিয়ে দলটি মাত্র ৮২২টি ভোট পেয়েছিল। তৃতীয় একজন প্রার্থী, কৃষ্ণ কুমার দেববর্মা আমবাসা কেন্দ্র থেকে নির্দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৩৭৬টি ভোট পান। তাঁকে নিয়ে এনসিপিআই (NCPI)-সমর্থিত সমস্ত প্রার্থীরা মোট ১,১৯৮টি ভোট পান। কোনও প্রার্থীই জয়ের কাছাকাছি পৌঁছতে পারেননি।

ত্রিপুরায় এনসিপিআই-এর হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বেশ কয়েকজন প্রার্থীর দাবি, নির্বাচনের পরেই দলটি কার্যত উধাও হয়ে যায়। কৈলাসহর কেন্দ্রের প্রার্থী জাহাঙ্গির আলি জানিয়েছেন, "২০২৩ সালের নির্বাচনের সময় কলকাতা থেকে আসা শিউলি কুণ্ডু আমাদের প্রার্থী হওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। নির্বাচনের পর তাঁরা কাজকর্ম গুটিয়ে ফিরে যান। তাঁদের সঙ্গে আমাদেরও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।" আরেক প্রাক্তন প্রার্থী বরজেদা ত্রিপুরা বলেন, "স্থানীয় এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে দলের প্রতিষ্ঠাতা শান্তনু দে-র সঙ্গে পরিচয়ের পর আমি তাঁদের হয়ে নির্বাচনে লড়ি। তাঁরা আমার কাছে কোনও টাকা চাননি এবং প্রচারও তেমন একটা হয়নি। তাঁরা মূলত চেয়েছিলেন প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিন। নির্বাচনের পর তাঁদের সঙ্গে আমার আর কোনও যোগাযোগই থাকেনি।"

ত্রিপুরা থেকে সংসদ পর্যন্ত

শান্তনু দে আরও জানান, শুরুতে তাঁরা ২০২৩ সালের পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত নির্বাচনে লড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। শোনা যায়, ত্রিপুরা নির্বাচনের পর দলের ভেতরে কোন্দল শুরু হয়। বিশেষ করে আর্থিক বিষয় নিয়ে মতপার্থক্যের জেরে সাংগঠনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। তিনি আরও জানান, পরবর্তীকালে তিনি দলের নেতৃত্বকে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু সম্পদের অভাবে সেই প্রস্তাব আর এগোয়নি। রাজনৈতিক উপস্থিতি সীমিত হওয়া সত্ত্বেও এনসিপিআই এখন এমন একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যার মধ্যে লোকসভায় তৃণমূলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ রয়েছেন।

তৃণমূল থেকে আলাদা হওয়ার ঘোষণা করার পর বিদ্রোহী সাংসদরা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে বসার জন্য পৃথক ব্যবস্থার দাবি জানান। বৈঠকের পর বিদ্রোহী সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানান, বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি পৃথক সংসদীয় দল হিসেবে স্বীকৃতির আবেদন জানিয়ে একটি চিঠি জমা দিয়েছে। তৃণমূল নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় পরবর্তীতে নিশ্চিত করেন যে বিদ্রোহী অংশটি এনসিপিআই-এর সঙ্গে মিশে গেছে। তিনি দলটিকে একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল হিসেবে অভিহিত করেন। এই সংযুক্তিকরণের ফলে এনসিপিআই এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।