কলকাতা মেট্রো রেলের ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো করিডোরে (গ্রিন লাইন) চালকহীন মেট্রো পরিষেবা চালুর পথ প্রশস্ত হয়েছে। সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিদর্শনের পর 'কমিশনার অফ রেলওয়ে সেফটি' (CRS) চালকহীন মেট্রো চালানোর অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে কলকাতার যাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় মেট্রো পরিষেবা চালুর আশা জেগেছে।
কলকাতা মেট্রো রেলের ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো করিডোরে (গ্রিন লাইন) চালকহীন মেট্রো পরিষেবা চালুর পথ প্রশস্ত হয়েছে। সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিদর্শনের পর 'কমিশনার অফ রেলওয়ে সেফটি' (CRS) চালকহীন মেট্রো চালানোর অনুমোদন দিয়েছে। এর ফলে কলকাতার যাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় মেট্রো পরিষেবা চালুর আশা জেগেছে। মেট্রো সূত্রের খবর অনুযায়ী, পরিদর্শনের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখার পর CRS চালকহীন মেট্রো চালানোর ছাড়পত্র দিয়েছে। তবে মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি। বর্তমানে গ্রিন লাইনের হাওড়া ময়দান-সেক্টর ৫ রুটে চালকহীন মেট্রো পরিষেবা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত রবিবার হাওড়া ময়দান থেকে সল্টলেক সেক্টর ৫ পর্যন্ত চালকহীন মেট্রোর পরীক্ষামূলক চলাচল (টেস্ট রান) ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিদর্শন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মেট্রো সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুরো রুটটি 'কমিউনিকেশন-বেসড ট্রেন কন্ট্রোল' (CBTC) সিগন্যালিং প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ চালকবিহীন (Driverless) মেট্রোর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রথম পর্যায়ে এই পরিষেবা দিল্লি মেট্রোর ম্যাজেন্টা লাইনে (জনকপুরী ওয়েস্ট থেকে বোটানিক্যাল গার্ডেন) চালু হয়। পরে পিঙ্ক লাইনেও এই প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই ট্রেনে আলাদা করে কোনও লোকোমোটিভ চালক থাকেন না। ট্রেনের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ একটি অটোমেটিক ট্রেন অপারেশন (Automatic Train Operation - ATO) এবং অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার (OCC) থেকে করা হয়। ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ, স্টেশনে নির্দিষ্ট স্থানে থামা, দরজা খোলা ও বন্ধ করা, নির্ধারিত সময়ে যাত্রা শুরু করা—সবকিছুই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সঙ্গে সঙ্গে হস্তক্ষেপ করা যায়।
কীভাবে চালকবিহীন মেট্রো চলে
১. কমিউনিকেশন-বেসড ট্রেন কন্ট্রোল (CBTC)
এটি পুরো মেট্রো ব্যবস্থার "মস্তিষ্ক" হিসেবে কাজ করে। CBTC প্রযুক্তি ট্র্যাকের পাশের যন্ত্রপাতি এবং ট্রেনের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন রেডিও যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিটি মেট্রোর সঠিক অবস্থান ও গতি সব সময় নির্ধারণ করে। এর ফলে ট্রেনগুলির মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় থাকে এবং চলাচল আরও নির্ভুল হয়।
২. অপারেশনস কন্ট্রোল সেন্টার (OCC)
OCC হল পুরো মেট্রো নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এখান থেকে অপারেটররা পুরো ব্যবস্থার উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখেন। OCC ট্রেনের রুট, গতি এবং ট্রেনগুলির মধ্যকার দূরত্ব নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠায়, যাতে প্রতিটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে।
৩. অটোমেটিক ট্রেন অপারেশন (ATO)
এটি ট্রেনের ভেতরে থাকা একটি স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার ব্যবস্থা। ATO, OCC থেকে তথ্য গ্রহণ করে ট্রেনকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করে। এটি ট্রেনের মসৃণভাবে চলা শুরু করা, ট্র্যাকের বাঁক ও ঢাল অনুযায়ী গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ট্রেন থামানোর মতো কাজ সম্পন্ন করে।
নিরাপত্তা কতটা?
ড্রাইভারলেস মেট্রোতে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। ট্রেনের অবস্থান, গতি এবং সামনে অন্য ট্রেনের দূরত্ব সারাক্ষণ নজরদারিতে থাকে। যদি কোনও কারণে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না থাকে, তাহলে ট্রেন নিজে থেকেই গতি কমিয়ে দেয় বা প্রয়োজনে থেমে যায়। মানব ভুলের সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় এই প্রযুক্তিকে আরও নিরাপদ বলে মনে করা হয়।
জরুরি পরিস্থিতিতে কী হবে?
ট্রেনে জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং যাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুবিধা থাকে। কোনও সমস্যা হলে যাত্রীরা অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। প্রয়োজনে প্রযুক্তিগত কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দেন।
চালকবিহীন মেট্রোর সুবিধাগুলি
গতি বাড়বে, যাত্রার সময় কমবে
দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন (DMRC)-এর মতে, চালকবিহীন মেট্রো নির্দিষ্ট ও সমান গতিতে চলতে পারে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৯৫ কিলোমিটার, আর নিয়মিত পরিষেবায় প্রায় ঘণ্টায় ৮৫ কিলোমিটার বেগে চলবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খরচও তুলনামূলক কম হবে।
ট্রেনের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়বে
নতুন সিগন্যালিং ব্যবস্থার কারণে দুটি মেট্রোর মধ্যে দূরত্ব কমে যাবে। ফলে যাত্রীদের অপেক্ষার সময়ও কমবে। আগে যেখানে প্রায় ২ মিনিট অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন ৯০ থেকে ১০০ সেকেন্ডের মধ্যেই পরবর্তী ট্রেন চলে আসতে পারে।
ভুলের সম্ভাবনা কমবে
এই মেট্রো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। তাই চালকের ভুলের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। যদিও জরুরি পরিস্থিতির জন্য ট্রেনে একজন অ্যাটেনডেন্ট উপস্থিত থাকেন।
নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী
ট্রেন চালু, থামানো এবং দরজা খোলা-বন্ধ—সবই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রয়োজনে দূর থেকে (রিমোট) পুরো ব্যবস্থা পরিচালনা করা যায়। ট্র্যাকের প্রায় ৫০ মিটার সামনে কোনো বাধা বা বস্তু শনাক্ত হলে ট্রেন নিজেই ব্রেক কষতে সক্ষম।
প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর
যেসব স্টেশনে চালকবিহীন মেট্রো চলাচল করে, সেখানে প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর লাগানো থাকে। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে সম্পূর্ণ থামার পরই এই দরজা খোলে, ফলে যাত্রীদের নিরাপত্তা আরও নিশ্চিত হয়।
