তপন মল্লিক, প্রতিবেদক- এই মুহুর্তে রাজ্য রাজনীতির যে কোনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। মন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর থেকে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে জল্পনা। আপাতত তাকে নিয়ে চর্চার বিষয় শুভেন্দু তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবেন কিনা অথবা কবে তিনি বিজেপি বা অন্য কোনও  রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছেন ইত্যাদি। 

একদিকে নতুন বছর রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে শুভেন্দুর মন্ত্রিত্ব-সহ বিভিন্ন সরকারি পদে ইস্তফায় উল্লসিত বিজেপি শিবির। কারণ শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দিক আর না দিক তাতে তাদের যে কিছুটা হলেও লাভ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যদিকে এই ঘটনায় বাম-কংগ্রেস দুই বিরোধী শিবিরই তৃণমূল ও বিজেপিকে সমালোচনায় বিদ্ধ করছে। তবে শুভেন্দুর দলে থাকা নিয়ে এখনও আশা ছাড়েন নি তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ। মন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর শুভেন্দু নিজেও যেকটি সভায় গিয়েছেন সব জায়গাতেই মানুষের পাশে থাকা, মানুষের কাছে দায়বদ্ধতা ও মানুষের জন্য কাজের কথা বলছেন। 

নন্দীগ্রামের বিধায়ক শুভেন্দু মন্ত্রিত্ব ও অন্যান্য সরকারি পদ ছাড়লেও বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন নি। প্রসঙ্গত, এ রাজ্যের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে যে নন্দীগ্রাম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল, সেই আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে ছায়ার মতো ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেদিনের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যান্য তৃণমূল নেতারাও কিন্তু আজ শুভেন্দুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। কার্যত তারা দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়েছেন। একদা নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সঙ্গী, বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি শেখ সুফিয়ান শুভেন্দু অধিকারী মন্ত্রিত্ব ছাড়া বা দল ছাড়াকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাঁর মতে, তৃণমূলে  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই সব। কারও দল ছেড়ে যাওয়া বা আসায়  তৃণমূলের কোনও লাভ বা ক্ষতি হয় না। অন্যদিকে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের আরেক শরিক আবু তাহের চান শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলেই থাকুন। তাঁর বিশ্বাস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শুভেন্দুর একটিমাত্র বৈঠক হলেই জটিলতা কেটে যাবে। তিনি মনে করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই শুভেন্দুরও কোনও বিকল্প নেই তৃণমূল কংগ্রেসে।  

আরও পড়ুন- নন্দীগ্রামে খোল-করতাল নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী, উদ্বোধন করলেন রাস উৎসবের

আরও পড়ুন- 'মায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা-কেউ মানবে না', মমতার কথা মনে করিয়ে শুভেন্দুকে তোপ অভিষেকের

যদিও শুভেন্দুর ইস্তফার দিনই সন্ধ্যায় কালীঘাটে জরুরি বৈঠক ডেকে মমতা সুব্রত বক্সী, পার্থ চ্যাটার্জি, ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস প্রমুখ নেতাদের বার্তা দেন, শুভেন্দুর ছেড়ে যাওয়া নিয়ে নষ্ট করার সময় তাঁর নেই। তিনি মাঠে নেমেই এর মোকাবিলা করতে চান। সে কারণেই ৭ ডিসেম্বর থেকে নেতৃর জেলা সফরে বাছা হয়েছে বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা জেলা। অর্থাৎ যে জেলাগুলিতে শুভেন্দু পর্যবেক্ষক পদে ছিলেন। মমতা ওই জেলাগুলোতে মিটিং করবেন। সেদিনের বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙন রুখতে শীর্ষ নেতৃত্ব কীভাবে কাজ করবে সেই আলোচনাও প্রাধান্য পায়। বৈঠকে মমতা স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেন, কেউ দল ছাড়তে চাইলে আপত্তি নেই। তবে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করে, মানুষ এখনও মমতার সঙ্গেই আছেন। এখনই আশাহত হওয়ার মত কিছু ঘটেনি। 

তবে শুভেন্দুর ব্যাপারে এখনও আশা ছাড়েন নি তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ। ইতিমধ্যে দুবার শুভেন্দুর সঙ্গে বৈঠকে জট ছাড়ানোর চেষ্টা করে সফল না হলেও দলের প্রবীন সাংসদ সৌগত রায় বলেছেন, শুভেন্দু অধিকারী এখনও তৃণমূল কংগ্রেস দলেরই সদস্য এবং বিধায়ক। দলের আরেক প্রবীন নেতা ও মন্ত্রী  সুব্রত মুখোপাধ্যায়েরও আশা শুভেন্দু তৃণমূল ছেড়ে যাবেন না। লক্ষ্যনীয়; মন্ত্রিসভায় শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে যাওয়া দফতরগুলি মুখ্যমন্ত্রী এখন পর্যন্ত নিজের হাতেই রেখেছেন। এটা অন্য কোনও ইঙ্গিত কিনা তা বলা যাচ্ছে না। তবে শুভেন্দু অধিকারী এইচআরবিসি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে কল্যাণ ব্যানার্জিকে বসানো হয়েছিল। হলদিয়া উন্নয়ন পর্ষদে শুভেন্দুর ছেড়ে যাওয়া পদে জেলার রাজনীতিতে শুভেন্দু বিরোধী বলে পরিচিত শিউলি সাহা আসছেন বলে শোনা যাচ্ছে। 

আরও পড়ুন- মন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর আজ শুভেন্দুর প্রথম সভা মহিষাদলে, তাঁকিয়ে সারা বাংলা

আরও পড়ুন- আজ 'মালদা জেলা' নিয়ে তৃণমূল ভবনে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, কতটা প্রভাব ফেলবে 'শুভেন্দু' ইস্যু

তবে শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে তৃণমূলের ইতিবাচক ভাবনা রয়ে গিয়েছে। মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিলেও  শুভেন্দুকে নিয়ে তৃণমূল দলের একটা বড় অংশের ভাবনা কিন্তু বদলায়নি। তাদের ইচ্ছা শুভেন্দু তৃণমূলের মূল স্রোতে ফিরে আসুক। যে কারণে সৌগত রায়ের মতো নেতা বলেছেন, শুভেন্দুর বিষয়ে লাইন টানা ঠিক হবে না। কোনও কিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি। অনেকেই আকারে ইঙ্গিতে তাঁর মতোই বলছেন। মনে হচ্ছে তৃণমূল শুভেন্দুর সঙ্গে আলোচনার জন্য মুখিয়ে আছে।