ওই যে পূর্ব তোরণ-আগে / দীপ্ত-নীলে, শুভ্র রাগে / প্রভাত রবি উঠল জেগে / দিব্য পরশ পেয়ে। / নাই গগনে মেঘের ছায়া / যেন স্বচ্ছ স্বর্গ ছায়া / ভূবনভরা মুক্ত মায়া / মুগ্ধ - হৃদয় চেয়ে। / অতীত নিশি গেছে চলে, / চির-বিদায়-বার্তা ব'লে, / কোন আঁধারের গভীর তলে / রেখে স্মৃতি-লেখা। / এস এস ওগো নবীন,/ চলে গেছে জীর্ণ মলিন / আজকে তুমি মৃত্যু-বিহীন / মুক্ত-সীমা-রেখা।  কবিতার নাম বর্ষা-আবাহন

বরিশাল থেকে প্রকাশিত ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকার ২০তম বর্ষের বৈশাখ সংখ্যায় (বাংলা ১৩২৬, ইংরেজি ১৯২০) 'বর্ষা আবাহন' নামে এই কবিতাটি প্রথম দেখেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি এটি  দেখতে পান বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে। কিন্তু ওই কবিতার আগে কিম্বা শেষে কবির কোনও নাম ছিল না। শুধু ‘শ্রী’ উল্লেখ ছিল। দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি ছাপার ভুল নয়। কবি হয়ত নিজের নাম দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বলেই এমন করে লেখা হয়েছিল। 

বরিশাল থেকে প্রকাশিত ও সত্যানন্দ দাসগুপ্ত সম্পাদিত ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকা এবং কবিতা প্রকাশিত হওয়া স্বত্বেও নিজেকে আড়ালে রাখতে চান যে কবি তিনি জীবনানন্দ ছাড়া আর কে হতে পারেন। এ প্রশ্ন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের তখনই মনে হয়েছিল। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকার সবগুলো সংখ্যা পাওয়া যায় নি। তবে দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কয়েকটা সংখ্যা খুঁজে পেয়েছিলেন। 

তাঁর একনিষ্ঠ অনুসন্ধানে একই বর্ষের শেষ সংখ্যাটি অর্থাৎ চৈত্র সংখ্যাটি তিনি উদ্ধার করেন। যে সংখ্যাটিতে ব্রহ্মবাদী পত্রিকার সারা বছরের লেখা ও লেখক-লেখিকাদের বাৎসরিক সূচী ছাপা হয়েছিল। সেখানে বর্ষা আবাহন কবিতার কবির নাম কিন্তু উহ্য রাখা হয় নি আগের মতো। খুব স্পষ্টভাবেই সেখানে লেখা ছিল ওই কবিতার কবি হচ্ছেন জীবনানন্দ দাস, বি.এ.। 

‘বর্ষা-আবাহন’ কবিতাটিই কি ছাপার হরফে জীবনানন্দের প্রথম কবিতা? জীবনানন্দের প্রথম দিকের প্রায় সব কবিতাই প্রকাশিত হয়েছিল বরিশাল থেকে প্রকাশিত 'ব্রহ্মবাদী' পত্রিকায়। এই পত্রিকার সঙ্গে তাঁর পরিবার এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজনেরা বেশ ভালভাবেই যুক্ত ছিল।  

যতদূর জনা যায় 'ব্রহ্মবাদী' পত্রিকার জন্ম বাংলা ১৩০৭, ইংরেজি ১৯০১ সালে। তার মানে জীবনানন্দের দাশের জন্মের দুই বছর পরে ওই পত্রিকাটি আত্মপ্রকাশ করে। সেই সময়ে বরিশাল নিজেদের কথা প্রচারের উদ্দেশেই যে ওই পত্রিকা তা বলাই বাহুল্য। পত্রিকার আলোচ্য বিষয় ছিল ব্রাহ্মধর্ম, নীতি, শিক্ষা, সমাজতত্ত্ব।
এই পত্রিকার একেবারে গোঁড়ার দিকে সম্পাদক ছিলেন জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাসগুপ্ত। পরে অবশ্য তিনি ওই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবে 'ব্রহ্মবাদী' পত্রিকা জীবনানন্দ দাশের পারিবারিক পত্রিকার মতোই ছিল। তাঁর মা কুসুমকুমারী দেবীও এখানে কবিতা লিখতেন। বাবা সত্যানন্দও লিখতেন। জীবনানন্দ দাশের বর্ণনা থেকেই জানা যায় যে,  পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন তাঁর পিসেমশায় আচার্য মনোমোহন চক্রবর্তী। তাঁর পিসেমশায় তাঁদের বাড়িতে এসে তাঁর মাকে দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নিয়ে যেতেন।

'ব্রহ্মবাদী'পত্রিকাতেই যে জীবনানন্দের কবি প্রতিভার প্রথম প্রকাশ ঘটে, এটা নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ থাকে না। পরবর্তীতে একাধিক জীবনানন্দ গবেষক এমনকি কবির নিজের লেখা থেকেও সে কথা স্পষ্ট হয়।  জীবনানন্দের ছোট ভাই অশোকানন্দ কবির একেবারে কৈশোরের একটা কবিতার দুটি পংতি একবার স্মরণ করেছিলেন- ‘এল বুঝি বৃষ্টি এল / পায়রাগুলো উড়ে যায় কার্নিশের দিকে এলোমেলো’।  

বরিশালের মতো দুর্গম একটি প্রান্তিক শহর থেকে প্রকাশিত ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকা যে, খুব একটা প্রচার পায় নি, সে কথা বলাই যায়। তবে এটাই যে ছাপার হরফে জীবনানন্দের প্রথম কবিতা সেটা দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় খুব জোর দিয়ে বলেন নি। তবে কবিতায় কেন জীবনানন্দের নাম ছিল না, সে বিষয়ে তিনি তাঁর 'জীবনানন্দ: জীবন ও কবিতার আলোচনা' বইতে লিখেছেন, ‘বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় জীবনানন্দের যে সব প্রকাশিত কবিতা দেখা যায়, তাঁর মধ্যে এই কবিতাটিকেই এখন তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা বলেই মনে হয়। খুব সম্ভব জীবনানন্দ স্বেচ্ছায় ব্রহ্মবাদী-তে এই কবিতাটি লেখেননি, কারও অনুরোধ বা নির্দেশেই এই কবিতাটি লিখে দিয়েছিলেন। তাই নিজের নাম কবিতার সঙ্গে প্রকাশ করতে দেননি। এই নাম প্রকাশে তাঁর সংকোচ সম্বন্ধে আমার মনে হয়, যেহেতু ব্রহ্মবাদী ব্রাহ্মদের পত্রিকা এবং জীবনানন্দ নিজে ব্রাহ্ম হলেও ব্রাহ্মদের আচার অনুষ্ঠান, এমন কি সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানই এড়িয়ে চলতে ভালবাসতেন; সেই জন্যই হয়ত ঐ পত্রিকায় নাম প্রকাশ করতে চাননি।"

কারণ যাই হোক না কেন, ব্রহ্মবাদী পত্রিকার প্রকাশিত সেই 'বর্ষা-আবাহন' কবিতাটাই জীবনানন্দ দাশের প্রথম মুদ্রিত কবিতা হিসাবে স্বীকৃত। 
 
ঋণঃ  ফরিদ আহমেদ