Mamata Banerjee: তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের একাংশের অসন্তোষ, নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন এবং বিরোধীদের আক্রমণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। 

আর ঠিক কতটা একা হয়ে যাবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? তিনি কি আর কোনও দিন ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন? ২০২৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর থেকে এই প্রশ্নটাই বারবার ঘুরে ফিরে আসছে। শুক্রবারই মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায় বা কালীঘাটের থেকে দূরত্ব তৈরি করলেন প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ও শিলিগুড়ির মেয়র। আগেই মমতাকে ছেড়ে চলে গেছেন, রাজ্যের ২০ জন সাংসদ। প্রায় ৩৬ জন বিধায়ক। একের পর এক তৃণমূল শাসিত পুরসভা আর পঞ্চায়েতেও ভাঙন দেখা গিয়েছে। যা রীতিমত অস্বস্তি বাড়িয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

ভাঙছে তৃণমূল

১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেছিলেন তখন থেকেই তাঁর অনুগত সৈনিকদের তালিকায় প্রথমেই নাম ছিল ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকদের। এই তালিকায় ছিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্য়ায়, গৌতম দেবও। সেই সময় তৃণমূল কংগ্রেস যে সুসংগঠিত ছিল তা নয় , একদিকে কংগ্রেস, অন্যদিকে সিপিএম- তৎকালীন দুই শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে লড়াই। সেই সময়ও মমতাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছিলেন এঁরা। কিন্তু ২০২৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পরই তৃণমূল কংগ্রেস ক্রমশই ভাঙছে। বলা যায় ভেঙে খান খান হচ্ছে ঘাসফুল।

সঙ্গ ছাড়লেন জ্যোতিপ্রিয়-গৌতম!

তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিলেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী। রেশন দুর্নীতির কালে লেগে রয়েছে তাঁর গায়ে। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ইস্তফা দিয়েছেন। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ট হিসেবেই পরিচিত। প্রকাশ্য সমাবেশেই মমতা তাঁকে বালু বলে সম্বোধন করতেন। সেই জ্যোতিপ্রিয় এবার তৃণমূল থেকে দূরত্ব তৈরি করেছেন? গত সপ্তাতেই জ্যোতিপ্রিয়কে মমতা তৃণণূলের কর্মসমিতির সদস্য করেছিলেন। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই তাঁর এই পদত্যাগ ঘিরে তৈরি হয়েছে জল্পনা। যদিও জ্যোতিপ্রিয় বলেছেন, তিনি অসুস্থ। এই অবস্থায় দলীয় কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকা সম্ভব নয়। তাই সব পদ ছেড়ে দিলেন।

অন্যদিকে শিলিগুড়ির মেয়রের পদ ছাড়লেন গৌতম দেব। শিলিগুড়ির পুরকমিশনারের কাছে ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর বিভিন্ন পুরসভা এবং পুরনিগমের চেয়ারম্যান এবং মেয়রেরা পদত্যাগ করছেন। ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, বিধাননগরের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী, চন্দননগরের মেয়র রাম চক্রবর্তী। এ বার রাজ্যের আর এক পুরনিগম শিলিগুড়ির মেয়রও পদত্যাগ করলেন। অর্থাৎ, শিলিগুড়ির পুরবোর্ডও ভেঙে গেল।

মুখ ফিরিয়েছেন ফিরহাদ-অরূপ

তৃণমূলের প্রথম দিকের 'সৈনিক' হিসেবে পরিচিত ফিরহাদ হাকিম ও অরূপ বিশ্বাসও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন কালীঘাট থেকে। বিধানসভা ভোটে জমিতেছেন ফিরহাদ। তবে তিনি সম্প্রতি নাম লিখিয়েছেন বিরোধী গোষ্ঠী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের সঙ্গে। বিধানসভায় বিরোধী আসনেই বসেছিলেন তিনি। অন্য়দিকে অরূপ বিশ্বাস হারেছেন বিধানসভা ভোটে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মেসিকাণ্ডের ফাইল নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হয়েছে। এই অবস্থায় তাঁর দায়িত্বে থাকা তৃণমূলের একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার জন্য ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন অরূপ। তাতেই স্পষ্ট হচ্ছে তাঁর কালীঘাটের বিরাগভাজন হওয়ার কথা। যদিও অরূপ বা ফিরহাদ মমতার বিরোধিতায় একটিও কথা এখনও বলেননি।

প্রথম বিদ্রোহ

তৃণমূলের ভরাডুবি হওয়ার পরেই মমতা-অভিষেকের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্য়ায়, উত্তর উলুবেড়়িয়ার বিধায়ক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সন্দীপন সাহা। মূলত সই-জালিয়াতিকাণ্ডে তারা দুইজন প্রথম সরব হন। তারপরই বিদ্রোহীদের দল ভারি হতে শুরু করে। বর্তমানে ঋতব্রত দাবি করেছেন, তাঁদের দিকে রয়েছে তৃণমূলের ৬৫ জন বিধায়ক। তারাই আসল তৃণমূল। বর্তমানে তাদের দলেই ভিড়েছেন ফিরহাদরা।

সাংসদদের বিদ্রোহ

বিদ্রোহী ২০ সাংসদ অখ্যাত আঞ্চলিক দল NCPI-তে যোগ দিয়েছেন।

লোকসভা স্পিকার ওম বিড়লার অফিসে ১৮ মে চিঠি পাঠানো ১৯ সাংসদের পূর্ণ তালিকা

১. কাকলি ঘোষ দস্তিদার (বারাসত) — বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেত্রী

২. শতাব্দী রায় (বীরভূম) — ডেপুটি লিডার

৩. সায়নী ঘোষ (যাদবপুর)

৪. যুসুফ পাঠান (বহরমপুর)

৫. শত্রুঘ্ন সিনহা (আসানসোল)

৬. দীপক অধিকারী / দেব (ঘাটাল)

৭. রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় (হুগলি)

৮. মালা রায় (কলকাতা দক্ষিণ)

৯. জুন মালিয়া (মেদিনীপুর)

১০. পার্থ ভৌমিক (ব্যারাকপুর)

১১. বাপি হালদার (মথুরাপুর)

১২. মিতালি বাগ (আরামবাগ)

১৩. খলিলুর রহমান (জঙ্গিপুর)

১৪. আবু তাহের খান (মুর্শিদাবাদ)

১৫. অরূপ চক্রবর্তী (বাঁকুড়া)

১৬. ড. শর্মিলা সরকার

১৭. প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় (হাওড়া)

১৮. জগদীশ বর্মা বাসুনিয়া (কোচবিহার)

১৯. অসিত কুমার মাল

এইতালিকায় সর্বশেষ সংযোজন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও তাঁর স্ত্রী নয়না এখনও কালীঘাটের প্রতি অনুগত।

মমতার অস্বস্তি

এই পরিস্থিতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্য়ায় ও কুণাল ঘোষ। একজন সাংসদ। অন্যজন বিধায়ক। কল্যাণতো স্পষ্ট করেই মমতাকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন অভিষেক নিয়ে। যদিও তারপরেও তিনি এখনও পর্যন্ত মমতাকে ছেড়ে যাননি। একই অবস্থা কুণাল ঘোষেরও।

এই অবস্থায় প্রশ্ন আর ঠিক কতটা একা হবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রশ্ন তিনি কি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন? দেশের মধ্য়ে লড়াকু নেত্রী হিসেবেই পরিচিতি মমতার। তাই এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা।