প্রয়াত হয়েছেন বাংলার রাজনীতির একদা চাণক্য মুকুল রায় (Mukul Roy Death)। সল্টলেকের অ্যাপোলো হাসপাতালে রাত দেড়টা নাগাদ হার্ট অ্যাটাকের কারণে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
প্রয়াত হয়েছেন বাংলার রাজনীতির একদা চাণক্য মুকুল রায় (Mukul Roy Death)। সল্টলেকের অ্যাপোলো হাসপাতালে রাত দেড়টা নাগাদ হার্ট অ্যাটাকের কারণে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ছেলে শুভ্রাংশু রায় এই খবর নিশ্চিত করেছেন। গত কয়েক বছর ধরেই মুকুল রায় একাধিক স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০২৩ সালে হাইড্রোসেফালাসের জন্য তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাড়িতে পড়ে যাওয়ার পর তাঁর মাথায় আঘাত লাগে, যার ফলে রক্ত জমাট বাঁধে এবং অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। ২০২৩ সালের প্রথম দিকে ডাক্তাররা নিশ্চিত করেছিলেন যে তিনি ডিমেনশিয়া এবং পারকিনসন রোগে ভুগছেন। তিনি ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য বয়স-সম্পর্কিত অসুস্থতায়ও ভুগছিলেন, যা তাঁকে ২০২২ সাল থেকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রেখেছিল।
ব্যক্তিগতভাবে, মুকুল রায় একজন সুশৃঙ্খল পারিবারিক পটভূমি থেকে এসেছিলেন। তাঁর বাবা হরি দেব কৌশল ছিলেন দিল্লির একজন অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ কমিশনার এবং তাঁর মা অনুপ কৌশল ছিলেন একজন শিক্ষক। মুকুল রায়ের মৃত্যু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটায়। রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বিতর্ক সত্ত্বেও, রাজ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পুনর্গঠনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
মুকুল রায় বিতর্ক এবং রাজনৈতিক পদক্ষেপ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন পশ্চিমবঙ্গে একজন বিরোধী নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিলেন, তখন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন মুকুল। ১৯৯৮ সালে মমতা এবং অন্যদের সঙ্গে কংগ্রেস ত্যাগ করে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন মুকুল। তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠনের মধ্যে দ্রুত উত্থান লাভ করেন মুকুল এবং ২০০৬ সালে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। দলের তৃণমূলস্তরে নেটওয়ার্ক গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এর অন্যতম প্রধান সাংগঠনিক কৌশলবিদ হিসেবে বিবেচিত হন।
১৯৫৪ সালের ১৭ এপ্রিল জন্ম গ্রহণ করেন মুকুল রায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসির ডিগ্রি, তারপর ২০০৬ সালে পাব্লিক অ্যাডমিনিসট্রেশন নিয়ে মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করেন মুকুল রায়।
তৃণমূল কংগ্রেসের ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। মুকুল রায় ২০০৬ সালে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। ইউপিএ ২ সরকারের আমলে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদে যোগ দেন। তিনি প্রথমে জাহাজ চলাচল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ২০১২ সালের মার্চ মাসে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী নিযুক্ত হন।
কেন মুকুল রায় তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন এবং আবার ফিরে আসেন?
সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি এবং নারদ স্টিং অপারেশন সম্পর্কিত তদন্তে তাঁর নাম উঠে আসার পর তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে মুকুলের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ২০১৫ সালে তাঁকে দলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং অবশেষে ২০১৭ সালে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। বিজেপি তাঁকে জাতীয় সহ-সভাপতি পদে নিযুক্ত করে। তৃণমূলের মতো বিজেপির সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মুকুল।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয়লাভ করে বিজেপির পারফরম্যান্স রাজ্যের রাজনীতিতে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে কৃষ্ণনগর থেকে বিজেপির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। তবে, ২০২১ সালের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে আসেন। তবে বিধায়কপদ থেকে ইস্তফা দেননি। ফলে তৃণমূলে যোগ দিলেও মুকুল খাতায়কলমে বিজেপি বিধায়ক হয়েই থেকে গিয়েছিলেন। এমনকি, তাঁকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) চেয়ারম্যানও করা হয়েছিল। সাধারণত, ওই পদে বিরোধী দলের সদস্যকে বসানো হয়।
তাঁর এই পরিবর্তনের ফলে দলত্যাগ বিরোধী আইনের অধীনে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁর বিধায়ক পদ খারিজের দাবি জানান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপি বিধায়ক অম্বিকা রায়। বিধানসভার স্পিকার মুকুল রায়ের পদ খারিজ করতে অস্বীকার করায় মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। ২০২৫ সালে হাইকোর্ট মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজের নির্দেশ দেয়। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যানের পদ বাতিল করা হয়। কিন্তু পরে সুপ্রিম কোর্ট আদেশে স্থগিতাদেশ দেয়।
মুকুল রায়ের মোট সম্পদ
সাম্প্রতিক নির্বাচনী হলফনামায় তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৫০.৮৫ লক্ষ টাকা দেখানো হয়েছে।


