লাগামছাড়া বিক্ষোভে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ট্রেন, জ্বালানো হয়েছিল স্টেশন। উন্মত্ত জনতার রোষ থেকে বাদ যায়নি বাস, গাড়ি, সরকারি অফিসও। নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে গোটা মুর্শিদাবাদ জেলা জুড়ে তাণ্ডবের ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলা- সহ গোটা দেশে। তার ফল যা হওয়ার তাই হল। বছর শেষেও মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে পর্যটকদের দেখা নেই। 

হিংসাত্মক বিক্ষোভের ছবি দেখেই আতঙ্কে অধিকাংশ মানুষ মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে মুখ ঘুরিয়েছেন বলেই মনে করছেন এলাকার পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তবে শুধু আতঙ্কই একমাত্র কারণ নয়। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ যাতায়াতে অন্যতম প্রধান ভরসা রেল। বিশেষত পর্যটকরা ট্রেনে যাতায়াত করতেই বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু বিক্ষোভের সময় রেল স্টেশন, লাইন এবং ট্রেনের যে ক্ষতি হয়েছিল তা সামলে উঠে এখনও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়নি শিয়ালদহ- লালগোলা শাখায়। ফলে ইচ্ছে থাকলেও ট্রেন না চলায় মুর্শিদাবাদ আশার ঝুঁকি নেননি বহু মানুষ।

আরও পড়ুন- দেড় কিলোমিটার দূরে থানা, পর পর ট্রেন পুড়লেও পৌঁছল না পুলিশ

আরও পড়ুন- আগুনে ভষ্মীভূত চারটি ট্রেন, প্রতিবাদের নামে বিনা বাধায় তাণ্ডব মুর্শিদাবাদে, দেখুন ভিডিও

শিল্পবিহীন মুর্শিদাবাদ জেলায় পর্যটন ব্যবসার উপরে নির্ভরশীল বহু মানুষ।  ওই শিল্পও একাধিক সমস্যা নিয়ে চলছে । তা সত্ত্বেও প্রতি বছর একটু একটু করে পর্যটক  বাড়তে শুরু করেছিল জেলায় । ইদানিং বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছিল মুর্শিদাবাদে ।ফলে কিছুটা হলেও জেলার পর্যটনকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন ওই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।  নতুন ভাবে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগও শুরু করেছিলেন।  কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কিছু মানুষ জেলা জুড়ে যে তাণ্ডব চালায়, তার ধাক্কায় জেলার ভাবমূর্তিই পর্যটকদের সামনে খারাপ হয়েছে। জেলা জুড়ে এখনও  অস্থিরতা রয়েছে। এর ফলে বাইরে থেকে যারা মুর্শিদাবাদ বেড়াতে আসবেন বলে ঠিক করেছিলেন, তাঁরা আর জেলাতে ঢুকতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে হোটেল  বুকিং যেমন বাতিল হয়েছে, সেরকমই হোটেল ছেড়ে তড়িঘড়ি ফিরেও গিয়েছেন বহু পর্যটক। যার জেরে লোকসানের মুখে পড়েছেন হোটেল মালিকরা। 

ডিসেম্বর মাসের শেষ হতেই প্রচুর সংখ্যায় পর্যটক আসেন মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত হাজারদুয়ারি প্যালেস দেখতে। হাজারদুয়ারি মিউজিয়াম প্যালেস সূত্রে জানা গিয়েছে, গত এক সপ্তাহে মাত্র ২৫ হাজার মতো পর্যটক এসেছিলেন। কিন্তু অন্যান্য বছর সেই সংখ্যাটাই আড়াই লক্ষের কাছাকাছি থাকে। পর্যটক সংখ্যা কমে যাওয়া ভরা শীতের মরশুমেও কার্যত শুনশান হাজারদুয়ারি, কাটরা মসজিদ, কাট গোলাপ বাগান, মতিঝিল চত্বর। ফলে প্রায় অলসভাবে দিন কেটেছে স্থানীয় পরিবহণ ব্যবসায়ী, গাই, রাস্তার ধারের রেস্তোরাঁ কর্মীদের। পর্যটকদের উপর নির্ভরশীল রাস্তার ধারে পসরা সাজিয়ে বসা দোকানগুলির ব্যবসায়ীদেরও কপালে চিন্তার ভাঁজ। উমর শেখ নামে এক দোকানদার বলেন, 'কার তাণ্ডবে কার ঘর পোড়ে। তার খোঁজ ক' জন রাখেন। এই মন্দা কাটবে কি না বুঝতে পারছিনা।'

হোটেল মালিক স্বপন দাস বলেন, 'মুর্শিদাবাদ শহরের হোটেল ব্যবসা মুলত পর্যটকদের উপরই নির্ভরশীল। অধিকাংশ হোটেলেই ডিসেম্বরের শুরু থেকে পর্যটকরা আসতে শুরু করেছিলেন। এবছর বুকিংও বেশ ভাল হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হোটেল ছেড়ে পর্যটকরা ফিরে গিয়েছেন, বুকিংও ক্যান্সেল করেছেন অনেকে। এই অবস্থায় ব্যবসা নিয়ে আমরা বেশ আতঙ্কিত।'

মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ অ্যন্ড কালচারাল ডেভলপমেন্ট সোসাইটির সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, 'পর্যটন মরশুমেই জেলা জুড়ে অস্থির পরিবেশের জন্য ইতিমধ্যে পর্যটন শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। জেলা প্রশাসনকে আমরা জানিয়েছি, এই অবস্থার উন্নতি করতে না পারলে এ বছর জেলার পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষ  চরম সঙ্কটে পড়বেন। তাই যত দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক করে পর্যটকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে।'