পুরুলিয়ার এক সাইকেল মিস্ত্রির পরিবার ১২ বছর ধরে বিদ্যুৎহীন ছিল। প্রতিবেশী এবং প্রশাসনের উদাসীনতায় অন্ধকারে ডুবে থাকা পরিবারটির পাশে দাঁড়ালেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর 'জনতা দরবার'-এ নালিশ জানানোর মাত্র ১২ দিনের মধ্যে তাঁদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়।
পুরুলিয়া: দারিদ্র্য মানে শুধু পেটের খিদে নয়, কখনও কখনও তা অসহায়তার চরম রূপ। পুরুলিয়া জেলার এক ছোট্ট গ্রামের সাইকেল মিস্ত্রি কৃষ্ণ বাউরি। তাঁর পরিবারের কাছে গত ১২টা বছর শুধুই অন্ধকার রাত হয়ে থেকে গিয়েছিল। বারোটা বছর ধরে সূর্য ডোবার পর ওই বাড়িতে আর আলো জ্বলেনি। কিন্তু এখন, মাত্র ১২ দিনের মধ্যে সেই বাড়ির ভাগ্য বদলে গেছে!
অন্ধকারে শেষ হয়ে গেল ছেলের স্বপ্ন
কৃষ্ণ বাউরির দুই সন্তান। পেটে খিদে থাকলেও ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দিনরাত সাইকেলের চাকা সারাই করতেন তিনি। মেয়ে অনেক কষ্টে নার্সিং পাশ করে সংসারের হাল ধরেছে। কিন্তু ছেলে? তার চোখে অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বাড়িতে আলো না থাকলে সে পড়বে কী করে? দশম শ্রেণির পর পড়ার খুব ইচ্ছে থাকলেও, রাতের অন্ধকার তার স্বপ্ন কেড়ে নেয়। আলোর অভাবে তাকে মাঝপথেই পড়াশোনা ছাড়তে হয়। কৃষ্ণ বাউরি যখন বলেন, "বাড়িতে আলো থাকলে আমার ছেলেও আজ একটা বড় চাকরি করত", তখন তাঁর গলা ধরে আসে।
দাদাগিরি আর দুর্ভাগ্যের মাঝে লড়াই
ব্যাপারটা শুধু টাকার অভাব ছিল না। প্রতিবেশীদের দাদাগিরি আর জমি বিবাদের অজুহাতে গরিব পরিবারটির বাড়িতে বিদ্যুতের তার আসতে দেওয়া হচ্ছিল না। এই অমানবিকতার জেরেই পরিবারটি অন্ধকারে ডুবে ছিল। গত ১২ বছর ধরে কৃষ্ণ বাউরি প্রায় প্রত্যেক অফিসারের পায়ে ধরেছেন, হাজারটা আবেদনপত্র নিয়ে অফিসের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন। কিন্তু কেউ সেই গরিব মানুষটার চোখের জল দেখেনি।
আশার আলো হয়ে এল 'জনতা দরবার'
যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে গেল, তখন কৃষ্ণ বাউরির স্ত্রী কল্পনা ও তাঁর মেয়ে শেষ আশা নিয়ে কলকাতা পাড়ি দেন। ১৩ জুলাই তাঁরা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর 'জনতা দরবার'-এ পৌঁছন। শত শত মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তাঁরা নিজেদের ১২ বছরের কষ্টের কথা জানান। সেখানকার আধিকারিকরা তাঁদের অভিযোগ নথিভুক্ত করে বলেন, "চিন্তা করবেন না, আপনাদের বাড়িতে আলো আসবে।" এই একটা কথাই ওই পরিবারের কাছে ভগবানের আশীর্বাদের মতো শোনাল।
১২ বছরের কষ্টের বিচার ১২ দিনে!
বিরোধী দলনেতার অফিস থেকে আসা একটা ফোন কল গোটা প্রশাসনকে নাড়িয়ে দেয়। যে ফাইল ১২ বছর ধরে এক চুলও নড়েনি, সেই ফাইলের কাজ মাত্র ১২ দিনে শেষ হয়ে গেল। পুলিশ ও বিদ্যুৎ দপ্তরের আধিকারিকরা নিজে থেকে ঘটনাস্থলে এসে, যারা বাধা দিচ্ছিল তাদের মুখ বন্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করেন।
শুক্রবার সন্ধে... কৃষ্ণ বাউরির বাড়ির কোণায় লাগানো বাল্বটা যখন জ্বলে উঠল, তখন গোটা পরিবারের চোখে আনন্দাশ্রু। ১২ বছর ধরে অন্ধকারে থাকা চোখগুলো সেদিন আলো দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। কৃষ্ণ বাউরি হাতজোড় করে বলেন, "শুভেন্দু অধিকারী আমাদের কাছে ভগবানের মতো এসে দাঁড়িয়েছেন।" বাড়ির অন্ধকার দূর হলেও, ছেলের নষ্ট হয়ে যাওয়া পড়াশোনার বছরগুলোর কষ্ট ওই আলোতেও কৃষ্ণ বাউরির মন থেকে যায়নি। তবে, "এখন থেকে আমার নাতি-নাতনিরা অন্তত আলোয় বসে পড়তে পারবে", এই শান্তিটুকু ওই বাবার মুখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

