Taki Rajbari Durga Puja 2026: টাকি রাজবাড়ির প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে বিষাদের সুর, পান্তা ভাত-কচুশাক খেয়ে ২৪ বেড়ার কাঁধে চড়ে কৈলাসে পাড়ি উমার ৩০৭ বছরের প্রাচীন পুবের বাড়ির দুর্গোৎসবে বিদায়ের প্রস্তুতি, প্রাচীন রীতিনীতি মেনেই উমাকে বিদায় জানাবেন পরিবারের সদস্যরা।

Taki Rajbari Durga Puja 2026: ঢাকের বাদ্যি থেমে আসছে, মণ্ডপে মণ্ডপে বিষাদের সুর। চার দিনের আনন্দ-উৎসব শেষে এবার উমাকে বিদায় জানানোর পালা। টাকির ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ির দুর্গোৎসবে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ। উত্তর ২৪ পরগনার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী টাকির ৩০৭ বছরের প্রাচীন পুবের বাড়িতে দেবী দুর্গার বিদায়পর্ব ঘিরে চলছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি। পান্তা ভাত ও কচুশাকের নিবেদন, সিঁদুর খেলা, মঙ্গলযাত্রা এবং প্রাচীন পারিবারিক রীতিনীতি মেনেই উমাকে কৈলাসে ফেরানোর আয়োজন চলছে।

টাকির পুবের বাড়ির দুর্গোৎসব শুধু একটি পারিবারিক পুজো নয়, বরং কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাঙালির আবেগের এক অনন্য নিদর্শন। প্রায় ৩০৭ বছর ধরে চলে আসা এই দুর্গোৎসব আজও ধরে রেখেছে পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও প্রাচীন সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলালেও এই রাজবাড়ির পুজোর রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের টান আজও অমলিন।

পান্তা ভাত-কচুশাকের নিবেদন, ২৪ বেড়ার কাঁধে উমার কৈলাসযাত্রা

পুবের বাড়ির দুর্গোৎসবের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ দেবীর বিদায়পর্বের প্রাচীন রীতি। প্রচলিত পারিবারিক প্রথা মেনে দেবীকে পান্তা ভাত ও কচুশাক নিবেদন করা হয়। বাঙালির চিরপরিচিত গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই নিবেদন দুর্গোৎসবের শেষলগ্নে এনে দেয় এক বিশেষ মাত্রা।

এরপর ২৪ বেড়ার কাঁধে চড়ে উমার কৈলাসযাত্রার ঐতিহ্য এই পুজোকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতির মধ্য দিয়ে দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সিঁদুর খেলার লাল রঙে রাঙা হয়ে ওঠে বিদায়বেলা। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি উপস্থিত ভক্তদের মনেও তখন আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে বিচ্ছেদের বেদনা।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন পুবের বাড়ি

টাকির পুবের বাড়ির দুর্গোৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অবিভক্ত বাংলার স্মৃতি। একসময় বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই ঠাকুরদালানে মিলিত হতেন। দেশভাগের পর ভৌগোলিক সীমানা বদলে গেলেও ঐতিহ্যের টান মুছে যায়নি। আজও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, ভিনরাজ্য এমনকি বিদেশ থেকেও বহু মানুষ এই প্রাচীন দুর্গোৎসব দেখতে আসেন।

পুরনো দিনের স্মৃতি, পারিবারিক পরম্পরা এবং প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের আকর্ষণেই প্রতিবছর পুবের বাড়ির ঠাকুরদালানে ভিড় জমান দর্শনার্থীরা। তাঁদের কাছে এই পুজো কেবল দেবী দর্শনের উপলক্ষ নয়, বরং বাঙালির শিকড় ও ইতিহাসকে কাছ থেকে অনুভব করার একটি বিশেষ সুযোগ।

ইছামতির বুকে দুই বাংলার আবেগ

টাকি মানেই ইছামতি নদী, আর ইছামতি মানেই দুই বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক বন্ধন। নদীর এক পারে ভারত, অন্য পারে বাংলাদেশ। মাঝখানে আন্তর্জাতিক সীমান্ত থাকলেও ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আবেগ আজও দুই বাংলার মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

টাকির দুর্গোৎসব এবং প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরেও রয়েছে সেই আবেগের ছোঁয়া। ইছামতি নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা টাকির ঐতিহ্য দুই বাংলার মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পুবের বাড়ির দুর্গোৎসব তাই একটি পরিবারের পুজোর গণ্ডি ছাড়িয়ে সীমান্ত বাংলার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিদায়বেলায় বিষাদের সুর, অপেক্ষা আগামী বছরের

দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে যে আনন্দে কয়েক দিন মুখর থাকে রাজবাড়ির ঠাকুরদালান, বিসর্জনের সময় সেই আনন্দই ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিষাদে। মায়ের বিদায়লগ্নে চোখে জল আসে ভক্তদের। আবারও একটি বছরের অপেক্ষা শুরু হয়। উমা ফিরে যাবেন কৈলাসে, কিন্তু রেখে যাবেন আনন্দ, স্মৃতি ও আগামী বছরের নতুন আশার বার্তা।

পান্তা ভাত-কচুশাকের নিবেদন থেকে ২৪ বেড়ার কাঁধে উমার কৈলাসযাত্রা—টাকির পুবের বাড়ির প্রতিটি আচারেই জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও বিশ্বাস। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটলেও মানুষের হৃদয়ে দেবীকে ঘিরে আবেগ থেকে যায় সারা বছর।

বিজয়ার বিষাদে তাই আজও একটাই প্রত্যাশা—উমা আবার ফিরবেন আপন নীড়ে, আবার আলোয় ভরে উঠবে ঠাকুরদালান, আবার ধ্বনিত হবে ঢাকের বাদ্যি। সেই আশাতেই টাকির পুবের বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হয় বাঙালির চিরন্তন উচ্চারণ—‘আসছে বছর আবার হবে।’

আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।