সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে…
মধ্যমগ্রামে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রাঠ খুনের ঘটনাকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি। বুধবার গভীর রাতে উত্তর ২৪ পরগনার দোহারিয়া এলাকায় দুষ্কৃতীদের গুলিতে মৃত্যু হয় তাঁর। এই ঘটনার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
সূত্রের খবর, নয়াদিল্লিতে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সাংবিধানিক পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরে আলোচনা চলছিল। চন্দ্রনাথ রাঠ খুনের ঘটনা সেই আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে বলেই দাবি রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
বুধবার, ৭ মে ২০২৬-এ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃতীয় সরকারের সাংবিধানিক মেয়াদ। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২৯৪টির মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে রাজ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এর ফলে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটতে চলেছে।
তবে এখনও পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা দেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁকে অন্তর্বর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিও এখনও রাজ্যপালের তরফে ঘোষণা করা হয়নি বলে সূত্রের দাবি। ফলে প্রশাসনিক ও সাংবিধানিকভাবে এক ধরনের অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে সামনে এসেছে সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনও রাজ্যে সাংবিধানিক যন্ত্র ভেঙে পড়লে কেন্দ্র রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারে।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে কার্যত পূর্ণাঙ্গ নির্বাচিত সরকার নেই। বিদায়ী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়েছে, আবার নতুন সরকার এখনও শপথ নেয়নি। এই মধ্যবর্তী সময়েই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা নিয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে আলোচনা চলছে।
এক প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্য,
“পরিস্থিতি আগেই আলোচনায় ছিল। তবে মাটির পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠায় বিষয়টি এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।”
ধবার গভীর রাতে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের দোহারিয়া এলাকায় নিজের কালো স্করপিও গাড়ির ভিতরে বসে ছিলেন চন্দ্রনাথ রাঠ। সেই সময় মোটরবাইকে এসে দুষ্কৃতীরা খুব কাছ থেকে গুলি চালায় বলে অভিযোগ।
পুলিশ সূত্রে খবর, অন্তত চার রাউন্ড গুলি চালানো হয়। তার মধ্যে তিনটি গুলি লাগে চন্দ্রনাথ রাঠের শরীরে, যার মধ্যে বুকে ও মাথাতেও গুলি লাগে। তাঁকে দ্রুত একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।
ঘটনায় আরও এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁর চিকিৎসা চলছে। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে, যদিও এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলিও আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলে চিহ্নিত করেছে বলে সূত্রের দাবি। কয়েকটি জেলাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতা, কর্মী এবং তাঁদের ঘনিষ্ঠদের উপর হামলার আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে গোয়েন্দা রিপোর্টে। এই রিপোর্ট ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে বলেও জানা যাচ্ছে।
নির্বাচনের সময় মোতায়েন হওয়া বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য এখনও রাজ্যে রয়েছেন। সূত্রের খবর, প্রায় আড়াই লক্ষ কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর জওয়ান পশ্চিমবঙ্গে মোতায়েন ছিলেন ২৩ ও ২৯ এপ্রিলের ভোটপর্বে। তাঁদের একাংশ এখনও বিভিন্ন জেলায় দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়াও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ আধিকারিকেরাও রাজ্যে অবস্থান করছেন এবং সরাসরি পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন।
মঙ্গলবারই নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে কড়া নির্দেশ দেয়। কমিশনের তরফে ভোট-পরবর্তী হিংসার ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে স্পর্শকাতর এলাকায় সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের এই আবহে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর দেশের রাজনৈতিক মহলের।
