কেন্দ্রের নিয়ম মেনে স্মার্ট মিটার চালু করা বাধ্যতামূলক! কবে থেকে ঘরে ঘরে বসছে স্মার্ট মিটার? নিয়মই বা কী?
রাজ্যে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের জন্য আবার শুরু হতে চলেছে স্মার্ট মিটার বসানোর প্রক্রিয়া। তবে এবার আর পুরনো ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না প্রশাসন। আগের দফার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার রণকৌশলে বড়সড় বদল আনল রাজ্য সরকার। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও উদ্বেগ দূর করতে মূলত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমত, আমজনতার জন্য প্রিপেইড নয়, আনা হচ্ছে পোস্ট-পেইড স্মার্ট মিটার। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের দুয়ারে যাওয়ার আগে এই প্রযুক্তির পরীক্ষা হবে সরকারি কর্মীদের আবাসনে।

উল্লেখ্য, আগের সরকারের আমলেও গৃহস্থালি স্তরে স্মার্ট মিটার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেবার রাজ্য জুড়ে ব্যাপক জনঅসন্তোষ তৈরি হয়। ভূরি ভূরি অভিযোগের জেরে গত বছর কার্যত বাধ্য হয়েই সেই কর্মসূচি স্থগিত করে দিতে হয়েছিল প্রশাসনকে।
কেন তৈরি হয়েছিল জনঅসন্তোষ? গত দফায় রাজ্যে প্রায় ৬০ হাজার স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছিল। তারপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন গ্রাহকদের একটা বড় অংশ। তাঁদের অভিযোগ ছিল, নতুন মিটার বসার পর থেকেই বিদ্যুতের বিল অস্বাভাবিক রকম বেড়ে গিয়েছে। এর পাশাপাশি আর একটা বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল প্রিপেইড ব্যবস্থা। মোবাইলের মতো আগে রিচার্জ করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের এই নিয়মে চরম সমস্যায় পড়েন সাধারণ মানুষ। অনেক সময়ই দেখা যেত, অসময়ে মিটারের ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাওয়ায় আচমকা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আর তা পুনরায় চালু করতে গিয়ে কালঘাম ছুটত গ্রাহকদের।
কেন্দ্রের 'আরডিএসএস' প্রকল্প ও রাজ্যের বাধ্যবাধকতা বিদ্যুৎ দপ্তরের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, কেন্দ্রের 'রিভ্যাম্পড ডিস্ট্রিবিউশন সেক্টর স্কিম' (RDSS) বাস্তবায়নে রাজ্য বদ্ধপরিকর। এই প্রকল্প অনুযায়ী সরকারি ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকাগুলিতে ধাপে ধাপে স্মার্ট মিটার বসানো বাধ্যতামূলক। তবে কেন্দ্রের নিয়ম মানতে গিয়ে সাধারণ মানুষের সমস্যা হোক, তা চাইছে না রাজ্য। তাই এবার জনমানসের উদ্বেগকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রিপেইড জট কাটল, স্বস্তি পোস্ট-পেইডে সরকারি সূত্রের খবর, স্মার্ট মিটার নিয়ে আমজনতার সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল প্রিপেইড পদ্ধতিতেই। আচমকা লাইন কেটে যাওয়ার ভয় তাড়া করে বেড়াত অনেককেই। সাধারণ মানুষের এই মানসিকতা ও আপত্তির কথা মাথায় রেখেই এবার সম্পূর্ণ পোস্ট-পেইড স্মার্ট মিটার বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থাৎ, বর্তমান ব্যবস্থার মতোই গ্রাহকরা আগে নিশ্চিন্তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন এবং মাসের শেষে রিডিং অনুযায়ী বিল আসবে। ফলে হঠাৎ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ার আর কোনও আশঙ্কা থাকবে না।
পাইলট প্রজেক্ট: নিশানা সরকারি আবাসন সাধারণ মানুষের ঘরে হাত দেওয়ার আগে এবার খোদ সরকারি কর্মীদের বেছে নিয়েছে প্রশাসন। প্রথম পর্যায়ে রাজ্য সরকারি কর্মচারী এবং সরকার-পোষিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের আবাসনে এই স্মার্ট মিটার বসানো হবে।
প্রশাসনের এক পদস্থ কর্তার কথায়, "এটিকে এক ধরনের পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলক ধাপ বলা যেতে পারে। সরকারি আবাসনে এই মিটার বসানোর ক্ষেত্রে বাধা বা প্রতিরোধের সম্ভাবনা কম। সেখানে কাজ করার সময় যদি কোনও কারিগরি ত্রুটি বা সমস্যা সামনে আসে, তবে তা আগে সংশোধন করা হবে। সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার পরেই সাধারণ গ্রাহকদের বাড়িতে এই ব্যবস্থা চালু করা হবে।"
সরকারি অফিসে কাজের গতি তুঙ্গে আবাসিক এলাকায় কিছুটা রয়েসয়ে এগোলেও, সরকারি দফতরগুলিতে কিন্তু স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ প্রায় শেষের মুখে। রাজ্যে মোট প্রায় ৯২ হাজার সরকারি অফিসের মধ্যে ইতিমধ্যেই ৮০ হাজার অফিসে এই মিটার বসানো হয়ে গিয়েছে। বিদ্যুৎ দপ্তর সূত্রের খবর, বাকি থাকা অফিসগুলিতেও আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিতর্ক ও গণ-বিক্ষোভের অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে এবার অনেক বেশি সতর্ক ও সুপরিকল্পিত পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। ধাপে ধাপে কাজ শেষ করার পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করাই এখন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
