পশ্চিমবঙ্গের মিড-ডে মিলে ডিমের বদলে পনির বা সয়াবিন দেওয়ার খবরে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পনির বা সয়াবিন ভালো বিকল্প হলেও, শিশুদের জন্য ডিমই সবচেয়ে সস্তা ও সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস।
পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকার সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলোর মিড-ডে মিলে ডিমের বদলে পনির এবং সয়াবিন দেওয়ার খবর নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পনির এবং সয়া ভালো বিকল্প হতে পারে, কিন্তু স্কুল পড়ুয়া শিশুদের জন্য ডিম এখনও সবচেয়ে সস্তা এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস।

ডিম/পনির সোয়াবিন- কোনটা পুষ্টিকর
এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালের নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিক্স বিভাগের সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান ডঃ ফারেহা শানাম বলেন, ডিম এবং দুগ্ধজাত খাবার প্রোটিনের সেরা উৎস। কারণ, মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ন'টি অত্যাবশ্যক অ্যামাইনো অ্যাসিডের সবগুলোই এতে রয়েছে। তাঁর কথায়, "প্রোটিনের কথা বললে ডিম, পনির, টফু, অঙ্কুরিত ছোলা, মুগ ডাল সবই চমৎকার উৎস। তবে ডিম এবং দুধ, দই, পনিরের মতো দুগ্ধজাত খাবারকে উন্নত মানের প্রোটিন হিসেবে ধরা হয়। কারণ এগুলোতে ন'টি জরুরি অ্যামাইনো অ্যাসিডই থাকে। তাই এগুলোকে 'সম্পূর্ণ প্রোটিন' বলা হয়, যা মানবদেহে সহজে হজম হয়।"
তিনি আরও বলেন, ডাল, অঙ্কুরিত ছোলা বা মুগের মতো উদ্ভিজ্জ উৎসগুলো পুষ্টিকর হলেও, সঠিক কম্বিনেশনে না খেলে এগুলো সম্পূর্ণ প্রোটিন জোগান দিতে পারে না। কারণ, এগুলোর মধ্যে কোনও না কোনও অ্যামাইনো অ্যাসিডের ঘাটতি থাকে।
এগিয়ে ডিম-ভাত!
ডঃ শানাম জানান, ডিমের বদলে পনির দিলে পুষ্টির দিক থেকে কোনও ক্ষতি নেই। তবে স্কুলের পুষ্টি কর্মসূচিতে খাবারের দাম এবং খাওয়ার সুবিধার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।তিনি বলেন, "ডিমের বদলে পনির দেওয়া যেতেই পারে, কিন্তু ভারতে দাম একটা বড় বিষয়। ডিমের চেয়ে পনিরের দাম বেশি। আবার অঙ্কুরিত ছোলা, সয়া বা পনিরের চেয়ে বাচ্চাদের জন্য ডিম খাওয়া অনেক বেশি সহজ। ডালে ফাইবার বেশি এবং পনিরে ক্যালসিয়াম বেশি থাকলেও, দামের কথা মাথায় রাখলে ডিমই প্রোটিনের একটি চমৎকার এবং সাশ্রয়ী উৎস।"
ডিমই সেরা!
একই সুরে কথা বলেছেন ডায়েট চিকিৎসক ডঃ সুনীত খান্না। তাঁর মতে, এই বিতর্কে শিশুদের পুষ্টির চাহিদাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তবে ইসকনের মতো সংস্থা বা জৈন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসকেও সম্মান করা জরুরি, যারা অহিংসার নীতি মেনে সারাজীবন নিরামিষাশী থাকেন।
তিনি বলেন, "যেসব স্কুলে ইসকন মিড-ডে মিল সরবরাহ করে, সেখানে ডিমের বদলে সয়া এবং পনির দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ইসকন বা জৈন সম্প্রদায়ের মতো সংগঠনগুলো তাদের বিশ্বাস এবং অহিংসার নীতির কারণে আজীবন নিরামিষ আহার করে। তাদের এই বিশ্বাসকে সম্মান জানানো উচিত।" ডঃ খান্না ডিমকে "প্রকৃতির অন্যতম সেরা খাবার" বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ডিমে উচ্চমানের প্রোটিন ছাড়াও ভিটামিন বি১২, কোলিন, ভিটামিন ডি এবং আয়রনের মতো জরুরি পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "নিরামিষ বিকল্পগুলোর মধ্যে সয়া (টোফু) ডিমের কাছাকাছি একটি বিকল্প, কারণ এটিও একটি সম্পূর্ণ প্রোটিন। পনিরও প্রোটিন এবং ক্যালসিয়ামের একটি চমৎকার উৎস। শাকসবজি থেকে ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে এগুলো ডিম বা সয়ার বিকল্প হতে পারে না।"
তাঁর মতে, স্কুলের খাবারে যদি ডিম বাদ দেওয়া হয়, তবে বিকল্প খাবারটির পুষ্টিগুণ যেন ডিমের সমতুল্য হয়। তিনি বলেন, "শেষ পর্যন্ত, আলোচনাটা কোনও আদর্শ নিয়ে নয়, বরং আমাদের শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে হওয়া উচিত। ডিমের বদলে অন্য কিছু দিলে, তাতে যেন সমপরিমাণ পুষ্টি থাকে। এর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সয়া, পনির, ডাল এবং দুগ্ধজাত খাবার ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি শিশুরই একটি স্বাস্থ্যকর এবং সুষম খাবার পাওয়ার অধিকার আছে।"


