দীর্ঘ ১৩ বছর পেশায় রয়েছেন তিনি। কাজ করতে গিয়েই সমস্যার কথা আঁচ করতে পারেন সৌরভ। সমসাময়িকে ইংরেজি ভাষা আজকাল যেখানে অপরিহার্য। সেখানে গ্রামীণ এলাকার চা বাগানগুলিতে উচ্চ শিক্ষায় বাধা হতে পারে এই ভাষাই।
গোটা বিশ্ব এখন স্মার্টফোনে মেতে আছে। প্রযুক্তি নির্ভরতা বেড়ে যাওয়াতে ডিজিটাল হয়েছে দেশের অধিকাংশ মানুষই। তবে, কিছু এলাকা আজও বদলায়নি। যেখানে স্প্রিংকলার সেচ, গাছের পাতায় লুপার, আর আঁধারে উন্নত শিক্ষাই যেন যকের ধন। এই আঁধারেই এক চিলতে মিঠে রোদের ঝিলিক পৌঁছে দেওয়ার নীরবে প্রচেষ্টা করে চলেছেন শিলিগুড়ির যুবক সৌরভ রায়। শহর শিলিগুড়ি পেরিয়ে যেখানে গ্রামীণ এলাকার শুরু, সেখানেই রয়েছে সমতল এলাকার একের পর এক চা বাগান। সেখানেই বেড়ে উঠছে চা শ্রমিক সন্তানেরা। সবার জন্যে শিক্ষা প্রচারে থাকলেও, সেই ঢক্কা নিনাদ অনেক সময়ই এখানে পৌঁছায় না। তবুও, প্রয়াস নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতেই থাকে। স্বার্থহীনভাবে এমনই ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করছেন পেশায় সাংবাদিক বছর একত্রিশের সৌরভ।
দীর্ঘ ১৩ বছর পেশায় রয়েছেন তিনি। কাজ করতে গিয়েই সমস্যার কথা আঁচ করতে পারেন সৌরভ। সমসাময়িকে ইংরেজি ভাষা আজকাল যেখানে অপরিহার্য। সেখানে গ্রামীণ এলাকার চা বাগানগুলিতে উচ্চ শিক্ষায় বাধা হতে পারে এই ভাষাই। চা বাগান পাড়ায়, শ্রমিকরা নিজেদের মধ্যে কথা বলেন তাঁদের মাতৃভাষায়। আর খুব প্রয়োজনে হিন্দি। কিন্তু, ইংরেজির গুরুত্ব নিয়ে মাথা ব্যথা নেই কারও। এই ডিজিটাল যুগে সবার জন্য বিশ্বের দুয়ার খুলে দেওয়ার স্বপ্ন চোখে নিয়েই চা শ্রমিকদের সন্তানদের 'অক্সফোর্ড ডিকশনারি' বিতরণ করে চলেছেন সৌরভ। তাও বেশ কয়েক বছর ধরে।
কোচবিহার জেলার দিনহাটায় জন্ম হলেও, সৌরভ এক দশক থাকেন শিলিগুড়িতে। খবর সংগ্রহের কাজে ছুঁটে গিয়েছেন নানা গাঁ-গঞ্জে। চষে ফেলেছেন একের পর এক চা বাগান। পেশার খাতিরে ঘুরেই তিনি উপলব্ধি করেন, চা বলয়ের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার পড়ুয়ারা নিজস্ব ভাষা বা হিন্দিতে সাবলীল হলেও ইংরেজিতে পিছিয়ে। তাই, ব্যক্তিগত উদ্যোগেই দুঃস্থ অথচ মেধাবী এমন চা শ্রমিক সন্তানদের মাঝে এই 'অক্সফোর্ড ডিকশনারি' বিতরণ শুরু করেন। প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক মেলা দায়, সেখানে ইন্টারনেটে ইংরেজি শব্দভাণ্ডার খোঁজা বোকামি ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে! তাই তাঁর উদ্যোগে সমৃদ্ধ হচ্ছে হাঁসখোয়া, কমলা, ভোজনারায়ণ, মতিধর ও বিজলিমুনির মতো একাধিক চা বাগান।
ডিজিটাল এই যুগে প্রত্যন্ত এলাকায় আজও ছাপা ডিকশনারিই তাৎপর্যপূর্ণ। চা বাগানে ইংরেজি শিক্ষায় পড়ুয়াদের উৎসাহ বাড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে ২ মে নিজের জন্মদিনে জাঁকজমকের উৎসব বা কেক কাটার আয়োজন না করে, জমানো টাকায় কেনা ভালো ডিকশনারি এবং শিক্ষা সামগ্রী নিয়ে হাজির হন বাগানে বাগানে। সৌরভের কথায়, 'মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়াই ভাগ্যের ব্যাপার, সেই সমস্ত চা বাগানে অনলাইন ডিকশনারি শব্দকোষ খোঁজা বেমানান। তাই, ইংরেজি শিক্ষায় ভালো একটি ইংরেজি ডিকশনারি অবশ্যই কাজের।'
যেমন সম্প্রতি হাঁসখোয়ার নবম শ্রেণির পড়ুয়া স্মিতা টিগ্গা, মানসি চিক ওঁরাও সম্প্রতি অক্সফোর্ড ডিকশনারি পেল। তাঁদের মন্তব্য, 'সারাদিন নানা কাজে গ্রামে আসেন দাদা। খবর সংগ্রহের মাঝেও, আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দাদার এমন ভাবনা সত্যিই আনন্দিত করে দেয়।' সম্প্রতি কমলা চা বাগানে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রিনা এক্কার উপস্থিতিতে পড়ুয়াদের হাতে ডিকশনারি তুলে দেন সৌরভ। রিনা এক্কা বলেন, 'প্রতি বছর সৌরভ বাগানে ডিকশনারি বিলি করেই জন্মদিন সেলিব্রেট করেন। এই মানবিক উদ্যোগ চা মহল্লার শিক্ষায় ভূমিকা রাখে বৈকি।'

একইভাবে মতিধর ও বিজলিমুনি চা বাগানে পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ সাহিদ হোসেনের উপস্থিতিতে আদিবাসী পড়ুয়ারা উপহার হিসেবে পেয়েছে ইংরেজি ডিকশিনারি। সাহিদের কথায়, 'বছরের নানা সময়ে শিক্ষা সামগ্রী এনে দিয়ে যান সৌরভ। তাঁর দেওয়া প্রিন্টেড ডিকশিনারি বাচ্চাদের কাজে লাগে।'
সৌরভ বলেন 'পাঠ্যবই প্রায় প্রতি বছরই শ্রেণি এবং সিলেবাসের সঙ্গে বদলে যায়। কিন্তু, একটি ডিকশনারি, একটি পরিবারে বা পাড়ায় বছরের পর বছর অনেক পড়ুয়ার কাজে লাগতে পারে। যা ইংরেজি শিক্ষায় অবদান রাখবে।' হাঁসখোয়া চা বাগানের রাজকুমার কাশ্যপও তরুণ সাংবাদিকের উদ্যোগকে কুর্নিশ জানিয়েছেন।


