বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিপা ভাইরাসকে (NiV) একটি জুনোটিক রোগ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, যার অর্থ এটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়।

West Bengal Nipah Virus Scare: বাংলায় নিপা ভাইরাসে (Nipah Virus In West Bengal)আক্রান্ত দুই নার্স। সোমবার রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের তরফ থেকে দুই নার্সের আক্রান্ত হওয়ার খবর জানানো হয়েছে। সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের হাসপাতালে কর্মরত ওই দুই নার্স। গত কয়েকদিন ধরে এক বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি আছেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে একজনের বাড়ি নদিয়ায় ও অপরজনের বাড়ি বর্ধমানের কাটোয়ায়। পূর্ব বর্ধমান, উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদিয়ায় কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং-এর কাজ চলছে। তবে এখনও পর্যন্ত আর কোনও আক্রান্তের খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওই দুই নার্স কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, সবটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নিপা ভাইরাস (What Is Nipah Virus) কী?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিপা ভাইরাসকে (NiV) একটি জুনোটিক রোগ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, যার অর্থ এটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এটি দূষিত খাবার বা সরাসরি মানুষে-মানুষে সংস্পর্শের মাধ্যমেও সংক্রমিত হতে পারে। মানুষের মধ্যে এই সংক্রমণ হালকা বা উপসর্গবিহীন অসুস্থতা থেকে শুরু করে মারাত্মক মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) পর্যন্ত হতে পারে।

নিপা ভাইরাস প্রথম ১৯৯৮-৯৯ সালে মালয়েশিয়ার একটি প্রাদুর্ভাবের সময় শনাক্ত হয়েছিল। সংক্রমণটি প্রধানত শূকর খামারিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং ১০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটায়। সেই প্রাদুর্ভাবটিই ভাইরাসটিকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। উচ্চ মৃত্যুহার, দ্রুত বিস্তার।

ভারতে, নিপা-এর ঘটনা সংখ্যায় কম হলেও গুরুতর ছিল। ২০০১ সালে এবং আবার ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। বহু বছর পর কেরল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, বিশেষ করে ২০১৮ সালে, যখন একাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তারপর থেকে, কেরলে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দেখা গিয়েছে, যা মূলত শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। ভারতের বাইরে, নিপা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রধানত বাংলাদেশে ঘটেছে, যেখানে ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে প্রায় প্রতি বছরই রোগী শনাক্ত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশেও বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা কম থাকলেও ঝুঁকির মাত্রা কম নয়।

নিপা ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?

সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) অনুসারে, নিপাহ ভাইরাস নিম্নলিখিত উপায়ে ছড়াতে পারে। আমরা কথা বলেছিলাম কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক অরিন্দম বিশ্বাসের সঙ্গে। তিনি জানিয়েছেন কীভাবে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ায়।

  • বাদুড় বা শূকরের মতো সংক্রামিত প্রাণীর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ
  • সংক্রামিত প্রাণী দ্বারা দূষিত খাবার গ্রহণ (যেমন রস বা ফল)
  • সংক্রামিত ব্যক্তির বা তার শারীরিক তরলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ

নিপা ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ (Common symptoms linked to Nipah virus)

ডাক্তারবাবু জানিয়েছেন, প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশী ব্যথা, বমি এবং গলা ব্যথা। এগুলি পরবর্তীতে মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, তন্দ্রা এবং স্নায়বিক লক্ষণে পরিণত হতে পারে, যা এনসেফালাইটিসের ইঙ্গিত দেয়। গুরুতর ক্ষেত্রে তীব্র শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি এবং কোমা হতে পারে, কখনও কখনও ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই। মৃত্যুর হার ৪০% থেকে ৭৫% পর্যন্ত হতে পারে।

এর কি কোনও চিকিৎসা আছে?

চিকিৎসক অরিন্দম বিশ্বাস জানিয়েছেন, বর্তমানে নিপা ভাইরাসের জন্য কোনও নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিপা ভাইরাসকে গবেষণার জন্য একটি অগ্রাধিকার রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে রোগীদের আইসোলেশন, কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনে সংক্রামিত প্রাণী নিধন এবং প্রাণীদের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ।

নিপা ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় (Ways to protect yourself from Nipah virus)

  • বাদুড় দ্বারা দূষিত হতে পারে এমন ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • কাঁচা তাল বা খেঁজুরের রস খাবেন না।
  • ফল খাওয়ার আগে ভালভাবে ধুয়ে নিন, প্রয়োজনে উপরের ছালটা ছাড়িয়ে খান।
  • নিয়মিত হাত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন।
  • সংক্রমিত ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
  • অসুস্থ ব্যক্তিদের যত্ন নেওয়ার সময় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ব্যবহার করুন।
  • সম্ভাব্য সংক্রমণের পর কোনও উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।