
২২ বছরের এক ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তাল আইআইটি বম্বে। জাতপাতের বৈষম্য, কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। চলছে জোরদার ছাত্রবিক্ষোভ।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর পোয়াই ক্যাম্পাসের হস্টেলের ঘরে সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হয় সাহিল রবীন্দ্র ওয়াকোডের দেহ। সে এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের বিটেক ছাত্র ছিল।
সাহিলের পরিবার অভিযোগ করেছে, ক্যাম্পাসে জাতপাত নিয়ে লাগাতার কটাক্ষ ও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে তাকে। সাহিলের দিদা শ্যামলতা তায়ড়ে দাবি করেছেন, মানসিক নির্যাতনের কারণেই হয়তো সাহিল এই পথ বেছে নিয়েছে। তিনি হস্টেলের পরিবেশ ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এর মধ্যেই আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ পুলিশি অভিযোগে নাম থাকা অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লাকে সাসপেন্ড করেছে। পাশাপাশি, সাহিলের মৃত্যুর আগের ঘটনা নিয়ে তাদের প্রাথমিক বিবৃতিও প্রত্যাহার করে নিয়েছে তারা।
সাহিলের দিদা শ্যামলতা তায়ড়ে সোমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, মৃত্যুর পেছনের আসল কারণগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।
তাঁর মতে, আইআইটি বম্বের মানসিক নির্যাতনই সাহিলের আত্মহত্যার কারণ হতে পারে।
Yavatmal, Maharashtra: Shyamlata Tayade, grandmother of IIT Bombay student Sahil Wakode, who died by suicide on campus, alleged that he faced harassment and caste-based remarks from faculty members. She claimed Sahil had told his parents about the distress around eight days… pic.twitter.com/JexXn3lvUE
— IANS (@ians_india) September 21, 2026
তিনি সব পড়ুয়াকে সমান চোখে দেখার দাবি তুলে প্রশ্ন করেন, হস্টেলের পরিবেশ কি পড়ুয়াদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে?
তিনি জানান, পরিবারের পূর্ণ সমর্থন ছিল সাহিলের প্রতি। সে অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল, তাই তার আত্মহত্যার বিষয়টি পরিবার কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর কেন বাবা-মাকে আগে জানানো হলো না, তা নিয়েও ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। পরিবার এখন এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাইছে।
সাহিলের পিসিও অভিযোগ করেছেন যে, এই ঘটনার পেছনে বড় কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে। এএনআই-কে তিনি বলেন, "সোমবার সাহিল তার বাবাকে জাতপাতের বৈষম্যের কথা জানিয়েছিল। বাবা তাকে এসব এড়িয়ে শুধু পড়াশোনায় মন দিতে বলেছিলেন।"
#WATCH | Yavatmal: On IIT-Bombay student suicide, aunt of deceased Sahil Ravindra Wakode says, "...On Monday, he told his father about the caste-based discrimination he was facing. His father advised him, "Son, just focus on your studies. These things don't matter; focus on your… https://t.co/bRVBL3cPSD pic.twitter.com/jgqbkGf3B4
— ANI (@ANI) September 21, 2026
তিনি আরও বলেন, "আমরা প্রশাসনের কাছে সিবিআই তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। দোষীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তবেই সাহিল ও অন্যান্য পড়ুয়ারা বিচার পাবে। সিসিটিভি ফুটেজ সহ সমস্ত প্রমাণ আমাদের দিতে হবে। এর পেছনে বড় ষড়যন্ত্র রয়েছে, যেখানে ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টরও জড়িত থাকতে পারেন।"
সাহিলের বাবা রবীন্দ্র ওয়াকোডেও একই অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, আইআইটি বম্বেতে তাঁর ছেলেকে জাতপাতের বৈষম্য ও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে।
রবীন্দ্র জানান, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েও নিজের পরিশ্রমে এই দেশের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নিয়েছিল সাহিল। তাঁর অভিযোগ, নিচু জাতের বলে ফ্যাকাল্টি মেম্বার ও আধিকারিকরা সাহিলকে টার্গেট করেছিল।
বাবা আরও জানান, এক অধ্যাপকের কথা সাহিল বারবার বলত, যিনি তাকে নিচু জাতের বলে কটাক্ষ করতেন এবং মিথ্যে অভিযোগে ফাঁসিয়ে হেনস্থা করতেন।
সংবাদমাধ্যমের কাছে রবীন্দ্র সেই অধ্যাপকের নাম না নিলেও, পরে অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ দায়ের হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর সাহিলের পরীক্ষার সময় তিনিই ইনভিজিলেটর ছিলেন।
পড়াশোনা সংক্রান্ত কোনো কারণে সাহিল আত্মহত্যা করতে পারে, এই তত্ত্ব পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছেন রবীন্দ্র।
তিনি বলেন, সাহিল খুব শক্ত ধাতের ছেলে ছিল, সে আত্মহত্যা করার মতো ছেলেই নয়। আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ সাহিলকে বৈষম্যের শিকার বানিয়ে 'নির্যাতন' করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অবশ্য এই অভিযোগগুলো এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ সোমবার বিতর্ক বাড়তে থাকায় অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লাকে ডিন পদ থেকে সাসপেন্ড করেছে।
ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর শিরীষ বি. কেদারে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পাশাপাশি, সাহিলের মৃত্যুর আগের ঘটনা নিয়ে দেওয়া প্রাথমিক বিবৃতির কিছু অংশ প্রত্যাহার করে ক্ষমাও চেয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আইআইটি বম্বে জানিয়েছে, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই হওয়ার আগেই তারা তড়িঘড়ি ওই বিবৃতি দিয়ে ফেলেছিল।
সংশোধিত বিবৃতিতে তারা বলেছে, "সাহিলের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের আগের বিবৃতিতে যা বলা হয়েছিল, তার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।"
তারা আরও জানিয়েছে, পুরো বিষয়টি এখন উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের তদন্তাধীন রয়েছে।
তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সাহিলের মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলো নিয়ে মন্তব্য করা যে অনুচিত হয়েছিল, তা স্বীকার করে নিয়েছে ইনস্টিটিউট।
এর পাশাপাশি, ডিরেক্টর শিরীষ বি. কেদারে পদত্যাগ করেছেন বলে যে খবর রটেছিল, তাও খারিজ করে দিয়েছে আইআইটি বম্বে।
আইআইটি বম্বে গত ১৯ সেপ্টেম্বর দেওয়া প্রাথমিক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, মৃত্যুর দিন সাহিলকে পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়। তাদের দাবি ছিল, সাহিল চ্যাটজিপিটি-তে প্রশ্নপত্র আপলোড করে উত্তর খুঁজছিল।
তবে তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। ইনস্ট্রাক্টর এবং বিভাগীয় প্রধান সাহিলকে বুঝিয়েছিলেন যে এই ঘটনার কোনো প্রভাব তার কেরিয়ারে পড়বে না।
সেই বয়ান অনুযায়ী, এরপর সাহিল হস্টেলে ফিরে যায় এবং পরে তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়।
তবে এখন সেই বিবৃতি প্রত্যাহার করে ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের ওপরই বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া উচিত।
এরই মধ্যে আইআইটি বম্বে ফ্যাকাল্টি ফোরাম অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার পাশে দাঁড়িয়েছে।
ফোরামের দাবি, পরীক্ষার হলে এক ছাত্রকে বেআইনিভাবে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে দেখে অধ্যাপক দুল্লা কেবল ইনস্টিটিউটের নিয়ম মেনেই পদক্ষেপ করেছিলেন।
তাদের মতে, ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মিড-সেমিস্টার পরীক্ষায় ইনভিজিলেটরের দায়িত্বে ছিলেন দুল্লা। তখনই তিনি ওই ছাত্রকে ফোন ব্যবহার করতে দেখেন।
এই ঘটনাকে 'অ্যাকাডেমিক ম্যালপ্র্যাকটিস' আখ্যা দিয়ে ফোরাম জানিয়েছে, অধ্যাপক কেবল তাঁর দায়িত্ব পালন করে কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তাঁর সম্মানহানি করা হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।
পাশাপাশি, সাহিলের পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানিয়েছে ফ্যাকাল্টি ফোরাম।
মুম্বই পুলিশ সাহিলের মৃত্যু ঘিরে ওঠা অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি ক্রাইম ব্রাঞ্চের হাতে তুলে দিয়েছে।
ছেলের ওপর জাতপাতের বৈষম্য ও হেনস্থার অভিযোগ তুলে এফআইআর দায়ের করেছিলেন সাহিলের বাবা।
সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রায় তিন মাস ধরে সাহিলকে জাতপাত নিয়ে কটাক্ষ করা হচ্ছিল।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনের অধীনে মামলাটি দায়ের হয়েছে। তদন্ত এখনও চলছে।
সাহিলের মৃত্যুর পর পড়ুয়ারা আইআইটি বম্বে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
মৃত্যুর কারণের পাশাপাশি ইনস্টিটিউটের প্রাথমিক বিবৃতি, পরিবারের অভিযোগ এবং অভিযুক্ত পড়ুয়াদের প্রতি কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ পুলিশি তদন্ত চলাকালীনই অধ্যাপক দুল্লাকে সাসপেন্ড করা এবং আগের বিবৃতি প্রত্যাহার করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
সাহিলের পরিবারের একটাই দাবি, জাতপাতের বৈষম্য, মানসিক চাপ বা ক্যাম্পাসের পরিবেশ তার মৃত্যুর পেছনে কতটা দায়ী, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দেখা হোক।
অন্যদিকে, ফ্যাকাল্টি ফোরামের দাবি, অধ্যাপক দুল্লা কেবল পরীক্ষার নিয়মকানুন পালন করেছিলেন।
মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চ এখন সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখে সাহিলের মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলোর আসল সত্য সামনে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিবার, ইনস্টিটিউট এবং ফ্যাকাল্টি ফোরামের দাবিগুলো কেবলই পালটা বয়ান হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।