
বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই প্রকট তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কোন্দল। প্রথমে একগুচ্ছ বিধায়ক, তারপর দলের সাংসদরা রীতিমত বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে।
বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের মাত্র এক মাসের মধ্যেই তৃণমূল ভেঙে খান খান হয়ে গেছে বলেই ওয়াকিবহাল মহলের ধারনা। সাংসদ বিধায়করা নতুন ব্লক গঠনের কথা বললেও রাজ্যসভার একাধিক সাংসদ ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। সকলেরই পক্ষান্তে ক্ষোভ অভিষেকের বিরুদ্ধে।
তৃণমূলের আদি নেতাদের পাশাপাশি নতুন নেতারাও অভিষেকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। ঋতব্রত-সহ এমন অনেক বিদ্রোহী নেতা রয়েছেন, যাদের অভিষেকের হাত ধরেই তৃণমূলে উত্থান। তারাও দলের হার -সহ একাধিক কেলেঙ্কারির জন্য সরাসরি অভিষেককেই নিশানা করছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের হাতে তৈরি তৃণমূল কংগ্রেস। টানা ১৫ বছর বহাল তবিয়েতে শাসকদল ছিল। কিন্তু হারের পর যখন দল ভাঙছে, অভিষেকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে তখনও কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করছেন না- তাই নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দলের অন্দরে যেমন এই প্রশ্ন রয়েছে তেমনই প্রশ্ন উঠছে আম জনতার মধ্যেই।
মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের কাছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শুধুমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নন, তাঁর একমাত্র উত্তরাধিকার। নিজের তৈরি দলের ব্যাটন আগেই তিনি অভিষেকের হাতে তুলে দিতে উদ্যোগী হয়েছেন। দলের নেতৃত্ব রক্তের সম্পর্ক যার সঙ্গে রয়েছে তার হাতে নিরাপদ বলে মনে করেন মমতা। তাই দলের নেতাদের ক্ষোভের মুখে পড়েও অভিষেকের ডানা ছাঁটা কিছুটা কঠিন।
এই মুহূর্তে তৃণমূলের একটি বড় অংশের বিধায়ক আর সাংসদ অভিষেকের সমান্তরাল ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। এই পরিস্থিতিতে মমতা যদি অভিষেকের মাথা থেকে হাত সরিয়ে নেন তাহলে তৃণমূলের যেটুকু রাশ তাঁর হাতে রয়েছে সেটুকুও থাকবে না বলেও মনে করছেন অনেকে।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক কার হাতে থাকবে? পার্টি ফান্ডও কার হাতে থাকবে? তাই নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায় এখনও নিশ্চিত যে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রবল। দলের নিচুতলার কর্মীরা এখনও তাঁর অনুগত। আর সেই ভরাসাতেই দলের প্রথম সারির সাংসদ ও বিধায়কদের বিরোধিতা সত্ত্বেও অভিষেকের মাথা থেকে হাত সরাচ্ছেন না। তাহলে প্রতীক আর পার্টফান্ডও হাত ছাড়া হতে পারে এই আশঙ্কা রয়েছে। তেমনই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও নিশ্চিত তাঁর নিজের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে। পাশাপাশি বিক্ষুদ্ধ দলের সাংসদ বিধায়করাও মমতার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে নিশ্চিত। দলের বিক্ষুদ্ধ জনপ্রতিনিধিদের একটা অংশ মমতার জনপ্রিয়তার কথা স্বীকার করেছেন। কল্যাণ থেকে কাকলি এমনকি শতাব্দী রায়ও মমতার নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। প্রশ্ন তুলেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঔদ্ধত্য আর জীবনযাপন নিয়ে। অনেকেই মনে করছেন মমতা যদি এই অবস্থায় দলের ভাঙন আটকাতে চান তাহলে অভিষেকের মাথার ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিতে হবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের ভাইপো হিসেবেই রাজনীতিতে পরিচিতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের। একাধিক দুর্নীতি মামলার পাশাপাশি সই-জালিয়াতিকাণ্ডেও তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত শুরু করেছে বিজেপি সরকার। এই অবস্থায় মমতা হাত সরিয়ে নিয়ে নিজের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় অভিষেক আরও বিপাকে পড়তে পারেন- এই আশঙ্কাতেই মমতা অভিষেকের পাশে রয়েছেন বলেও দলেরই একটা অংশ মনে করছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে আদি বা প্রবীণ নেতাদের একাংশের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছেন দলীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, তবে নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কঠোর সাংগঠনিক পদক্ষেপ করছেন না মূলত পারিবারিক ও উত্তরাধিকারের বন্ধন, দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশলী কারণে। এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। যদিও এই বিষয়ে এখনও মমতা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেননি।