সব দেবতাকে সুন্দর, সুগন্ধি ফুল দেওয়া হয়, কিন্তু মহাদেবকে দেওয়া হয় কাঁটাওয়ালা, তীব্র বিষাক্ত ধুতুরা ফল ও ফুল। শ্রাবণ মাসে শিবলিঙ্গে ধুতুরা ছাড়া পুজো অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়। কিন্তু কেন দেবাদিদেবের এত প্রিয় এই বিষাক্ত ফল?
হিন্দু ধর্মে প্রত্যেক দেবতার পছন্দের ফুল-ফল আলাদা। যেমন বিষ্ণুর প্রিয় তুলসী, লক্ষ্মীর প্রিয় পদ্ম। তেমনই মহাদেব শিবের সবচেয়ে প্রিয় হল আকন্দ, বেলপাতা আর ধুতুরা। শিব পুরাণ অনুসারে, যে ভক্ত শিবলিঙ্গে একটি ধুতুরা ফল অর্পণ করে, তার সমস্ত মনস্কামনা পূরণ হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে ফল খেলে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, সেই ফল কীভাবে শিবের এত প্রিয় হল? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
১. পৌরাণিক কারণ - হলাহলের জ্বালা কমিয়েছিল ধুতুরা: পুরাণ মতে, সমুদ্র মন্থনের সময় যখন হলাহল বিষ বেরিয়ে আসে, তখন গোটা সৃষ্টি ধ্বংসের মুখে পড়ে। তখন দেবতাদের অনুরোধে মহাদেব সেই গোটা বিষ নিজের কণ্ঠে ধারণ করেন, হয়ে যান নীলকণ্ঠ। বিষের তীব্র জ্বালায় তাঁর সারা শরীর দগ্ধ হতে থাকে। তখন সমস্ত দেবতারা তাঁকে শান্ত করতে ঠান্ডা প্রকৃতির জিনিস - যেমন গঙ্গাজল, বেলপাতা, আকন্দ ও ধুতুরা নিবেদন করেন। ধুতুরা অত্যন্ত শীতল প্রকৃতির হওয়ায় শিবের সেই বিষের জ্বালা কমাতে সাহায্য করে। সেই থেকে ধুতুরা শিবের প্রিয়।
২. বিষকে অমৃত করার প্রতীক: শিব হলেন সংহার ও সৃষ্টির দেবতা। তিনি বিষকেও হজম করতে পারেন। ধুতুরা হল সেই বিষের প্রতীক। ভক্ত যখন শিবলিঙ্গে ধুতুরা দেয়, তখন সে প্রতীকীভাবে তার ভিতরের সমস্ত বিষ - যেমন অহংকার, হিংসা, লোভ, ক্রোধ শিবের চরণে সমর্পণ করে। অর্থাৎ, "হে প্রভু, আমার ভিতরের বিষাক্ততা তুমি গ্রহণ করো"।
৩. বৈরাগ্যের প্রতীক: অন্যান্য দেবতারা সুন্দর প্রাসাদে থাকেন, সুন্দর ফুল ভালোবাসেন। কিন্তু শিব থাকেন শ্মশানে, তাঁর গলায় সাপ, গায়ে ছাই। তিনি বৈরাগী। তাই সুন্দর গোলাপ নয়, কাঁটাওয়ালা, অবহেলায় বেড়ে ওঠা ধুতুরাই তাঁর বেশি প্রিয়। এটি বোঝায়, ভগবান বাইরের সৌন্দর্য নয়, ভক্তের ভক্তি দেখেন।
৪. আয়ুর্বেদ ও বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা: আয়ুর্বেদে ধুতুরাকে ‘কনক’ বলা হয়। এটি বিষাক্ত হলেও, পরিশোধন করে ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে থাকা অ্যাট্রোপিন ও স্কোপোলামিন হাঁপানি, ব্যথা ও চর্মরোগে কাজে লাগে। শিবকে বৈদ্যনাথ অর্থাৎ চিকিৎসকদের দেবতাও বলা হয়। তাই তিনি বিষকেও ঔষধে পরিণত করার ক্ষমতা রাখেন, ধুতুরা তারই প্রতীক।
৫. ধুতুরা অর্পণের সঠিক নিয়ম ও ফল: - শিবকে সবসময় সাদা ধুতুরা ফুল ও আস্ত ধুতুরা ফল দেবেন। ফল ভেঙে বা কেটে দিতে নেই। - শনিবার ও সোমবার শিবলিঙ্গে ধুতুরা দিলে শনি দোষ ও কালসর্প দোষ কাটে বলে বিশ্বাস। - নিঃসন্তান দম্পতিরা সন্তান লাভের জন্য শিবকে ধুতুরা ফল দেন। - খেয়াল রাখবেন, ধুতুরা পুজোর পর প্রসাদ হিসেবে খাবেন না, এটি হাত দিয়ে ধরার পর হাত ভালো করে ধুয়ে নেবেন।


