আয়কর রিটার্ন (ITR) জমার শেষ তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও নিয়ম সবার জন্য এক নয়। বেতনভোগী করদাতাদের ITR-1 ও ITR-2 জমা দেওয়ার শেষ দিন ৩১ জুলাই, ২০২৬-ই বহাল রয়েছে। 

জুলাই মাস শেষ হলেই দেশের কোটি কোটি করদাতার মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে ব্যস্ততা চরমে পৌঁছায়—আয়কর রিটার্ন (ITR) দাখিল। কেউ শেষ মুহূর্তে নথিপত্র গুছিয়ে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই দায়িত্ব সেরে ফেলেন। তবে এবারের মূল্যায়ন বর্ষে (Assessment Year 2026-27) শেষ তারিখ নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অনেকেই ভাবছেন, আইটিআর জমা দেওয়ার সময়সীমা কি সবার জন্যই বাড়ানো হয়েছে? বাস্তবে কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। আয়কর বিভাগ নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির করদাতাকে অতিরিক্ত সময় দিলেও অধিকাংশ বেতনভোগী করদাতার জন্য আগের সময়সীমাই বহাল রয়েছে।

আয়কর বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ মূল্যায়ন বর্ষের জন্য ইতিমধ্যেই চার কোটিরও বেশি করদাতা তাঁদের রিটার্ন দাখিল করেছেন। প্রতি বছরের মতো এবারও অনলাইন পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগে থেকেই রিটার্ন জমা দিলে প্রযুক্তিগত সমস্যা, তথ্য সংশোধন বা নথি সংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয়।

তাহলে কারা বাড়তি সময় পাচ্ছেন? যাঁদের ব্যবসা বা পেশা থেকে আয় রয়েছে কিন্তু তাঁরা ট্যাক্স অডিটের আওতায় পড়েন না, তাঁদের জন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়সীমা ৩১ আগস্ট, ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সাধারণভাবে এই শ্রেণির করদাতারা ITR-3 অথবা ITR-4 ফর্ম ব্যবহার করেন। এছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু ট্রাস্টও এই বর্ধিত সময়সীমার সুবিধা পাবে। ব্যবসা বা পেশার হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ করে প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করার জন্য এই অতিরিক্ত সময়কে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন কর বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে, যাঁরা চাকরি করেন এবং সাধারণত ITR-1 অথবা ITR-2 ফর্মে রিটার্ন দাখিল করেন, তাঁদের জন্য শেষ তারিখে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। অর্থাৎ বেতনভোগী করদাতাদের এখনও ৩১ জুলাই, ২০২৬-এর মধ্যেই আইটিআর জমা দিতে হবে। এই সময়সীমা পেরিয়ে গেলে বিলম্বিত রিটার্ন (Belated Return) জমা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে অতিরিক্ত খরচ ও কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা।

অনেকের ধারণা, করযোগ্য আয় না থাকলে আইটিআর জমা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। আয়কর আইন, ১৯৬১-এর ধারা ১৩৯(১) অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আয়ের পরিমাণ করমুক্ত সীমার নিচে হলেও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক অর্থবর্ষে বিদ্যুৎ বিল বাবদ এক লক্ষ টাকা বা তার বেশি ব্যয় হলে, চলতি (Current) অ্যাকাউন্টে ৫০ লক্ষ টাকা বা তার বেশি জমা পড়লে, বিদেশ সফরে দুই লক্ষ টাকা বা তার বেশি খরচ হলে, নির্ধারিত সীমার বেশি TDS বা TCS কাটা হলে, সেভিংস অ্যাকাউন্টে নির্দিষ্ট সীমার বেশি অর্থ জমা থাকলে কিংবা বিদেশে সম্পত্তি বা সেখান থেকে আয় থাকলে আইটিআর জমা দিতেই হবে।

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আইন মেনে চলার জন্যই নয়, ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও আইটিআর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নথি। ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া, হোম লোন বা গাড়ির ঋণের আবেদন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ভিসার আবেদনেও গত কয়েক বছরের আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়। ফলে নিয়মিত আইটিআর দাখিল করলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন আর্থিক প্রয়োজনে তা বড় সুবিধা দেয়।

সময়সীমা অতিক্রম করলে কী হতে পারে? নির্ধারিত তারিখের পরে রিটার্ন জমা দিলে আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী লেট ফি দিতে হতে পারে। যদি কোনও কর বকেয়া থাকে, তবে তার উপর সুদও ধার্য হতে পারে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতি (Business Loss) বা মূলধনী ক্ষতি (Capital Loss) পরবর্তী বছরে বহন করার মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও হারিয়ে যেতে পারে। তাই শেষ দিনের ভিড় বা ওয়েবসাইটে অতিরিক্ত চাপের ঝুঁকি এড়িয়ে আগেভাগেই রিটার্ন জমা দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

এখন আয়কর বিভাগের ই-ফাইলিং পোর্টালে বেশিরভাগ তথ্যই আগাম পূরণ করা থাকে। Form 16, AIS (Annual Information Statement), TIS (Taxpayer Information Summary), ব্যাংকের সুদের তথ্য, TDS-এর হিসাবসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে খুব সহজেই অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করা যায়। তবে রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে সমস্ত তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনে কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আইটিআর জমার শেষ তারিখ সবার জন্য এক নয়। তাই অন্যের কথা শুনে সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগে নিশ্চিত করুন আপনি কোন শ্রেণির করদাতা এবং আপনার ক্ষেত্রে কোন সময়সীমা প্রযোজ্য। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে যেমন জরিমানা ও সুদের ঝুঁকি এড়ানো যায়, তেমনি ভবিষ্যতের আর্থিক লেনদেনেও বাড়ে বিশ্বাসযোগ্যতা। সচেতন থাকুন, সময়মতো আইটিআর জমা দিন এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন।