রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) দেশে কাগজের নোটের বদলে পলিমার বা প্লাস্টিকের নোট আনার কথা ভাবছে। কেন এই ভাবনা? কাগজের নোটের চেয়ে প্লাস্টিকের নোট কতটা টেকসই ও সুরক্ষিত? বিশ্বের কোন কোন দেশ ইতিমধ্যেই এই পথে হেঁটেছে?

আপনার পকেটে যে নোটটা রয়েছে, সেটা শুধু লেনদেনের মাধ্যম নয়, দেশের অর্থনীতি আর ভরসার প্রতীক। কিন্তু খুব শিগগিরই এই নোটের চেহারা পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI) পুরনো কাগজের নোটের বদলে পলিমার অর্থাৎ প্লাস্টিকের নোট আনার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবনাচিন্তা করছে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে ভারতীয় মুদ্রার ইতিহাসে এটি একটি বিশাল পরিবর্তন হবে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, সম্প্রতি পাটনা এবং মুম্বইতে RBI-এর বোর্ড মিটিংয়ে পলিমার নোট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। দেশে নগদের চাহিদা বৃদ্ধি, নোট তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং জাল নোটের সমস্যা মোকাবিলার মতো বিষয়গুলো মাথায় রেখেই এই বিকল্পটিকে এখন আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

RBI কেন এই বদল চাইছে?

ভারতের মতো বিশাল দেশে প্রতিদিন কোটি কোটি নোট বাজারে হাতবদল হয়। এর ফলে কাগজের নোট খুব তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে যায়, ময়লা হয় এবং নষ্ট হয়ে যায়। এই নোটগুলো বারবার ছাপতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের বিপুল খরচ হয়। এখানেই পলিমার নোটকে একটি ভালো বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিকের নোট সাধারণ কাগজের নোটের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ বেশি টেকসই। এই নোটের ওপর জল, ধুলো-বালি বা ময়লার তেমন কোনও প্রভাব পড়ে না। এই কারণেই অনেক দেশ ধীরে ধীরে কাগজের নোট বাতিল করে পলিমার মুদ্রা চালু করেছে।

জাল নোটের কারবার বন্ধ হতে পারে

পলিমার নোটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর সুরক্ষা। এই নোটগুলিতে স্বচ্ছ উইন্ডো, বিশেষ ধরনের কালি এবং উন্নত সুরক্ষা ফিচার যোগ করা হয়, যা নকল করা প্রায় অসম্ভব। যে সমস্ত দেশ জাল নোটের সমস্যায় ভুগছিল, তারা এই প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করেছে। ভারতেও সময়ে সময়ে জাল নোটের সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে, পলিমার নোট সুরক্ষার দিক থেকে একটি বড় সমাধান হতে পারে।

বিশ্বের এই দেশগুলি ইতিমধ্যেই প্লাস্টিক মুদ্রা ব্যবহার করছে

  1. অস্ট্রেলিয়া: প্লাস্টিকের নোট প্রথম চালু করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ১৯৮৮ সালে এখানে পলিমার নোট আনা হয়। আজ অস্ট্রেলিয়াকে এই প্রযুক্তির পথিকৃৎ বলে মনে করা হয়।
  2. নিউজিল্যান্ড: ১৯৯৯ সালে নিউজিল্যান্ড তাদের সমস্ত কাগজের নোট বদলে পলিমার নোট চালু করে। এখানে ৫ ডলার থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত সব নোটই প্লাস্টিকের।
  3. ভিয়েতনাম: ভিয়েতনাম ২০০৩ সালে পলিমার নোট চালু করে। আজ তাদের দেশের প্রায় পুরো মুদ্রাই প্লাস্টিক-ভিত্তিক। সবচেয়ে বড় নোটটি হল ৫ লক্ষ ভিয়েতনামী ডং।
  4. রোমানিয়া: ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে রোমানিয়া ২০০৫ সালে তাদের সমস্ত নোট পলিমারে পরিবর্তন করে।
  5. ব্রুনেই ও পাপুয়া নিউ গিনি: এই দেশগুলোও জাল নোট এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পুরোপুরি প্লাস্টিক মুদ্রা গ্রহণ করেছে।

এই ট্রেন্ড প্রায় ৬০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে

আজ বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে কোনও না কোনও রূপে পলিমার নোট ব্যবহার করা হচ্ছে। কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলিও তাদের মুদ্রা ব্যবস্থায় এটি চালু করেছে। তবে, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুদ্রা আমেরিকান ডলার এখনও পুরোপুরি প্লাস্টিকের নয়। মার্কিন নোটগুলি তুলো এবং লিনেনের বিশেষ মিশ্রণ দিয়ে তৈরি, যা সাধারণ কাগজের চেয়ে অনেক বেশি মজবুত।

ভারতে চালু হলে কী বদলাবে?

যদি RBI এই পরিকল্পনাকে অনুমোদন দেয়, তবে আগামী বছরগুলিতে ভারতীয়রা নতুন ডিজাইন এবং নতুন প্রযুক্তির নোট দেখতে পাবেন। এর ফলে নোটের আয়ু বাড়বে, জাল নোটের দাপট কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ছাপার খরচও বাঁচবে। তবে, এত বড় পরিবর্তন সহজ হবে না। নতুন নোট ছাপার মেশিন, এটিএম সিস্টেম এবং ব্যাঙ্কিং পরিকাঠামোকেও এর সঙ্গে মানানসই করে তুলতে হবে। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে ভারতে পলিমার নোট ধাপে ধাপে চালু করা হতে পারে।

ডিজিটাল পেমেন্টের যুগেও কেন নগদ ব্যবস্থায় বদল?

একদিকে দেশ দ্রুত ডিজিটাল পেমেন্টের দিকে এগোচ্ছে, অন্যদিকে নগদের চাহিদাও আগের মতোই রয়েছে। এই কারণেই RBI এখন নগদ ব্যবস্থাকে আরও টেকসই, সুরক্ষিত এবং আধুনিক করার দিকে নজর দিচ্ছে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে, তাহলে ভবিষ্যতে আপনার পকেটের নোটটি হয়তো কাগজের নয়, প্লাস্টিকের হবে।