করোনার মরশুমে ভিটামিন-সি নিয়ে রীতিমতো একটা হইচই শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন, ফলের রস খান, যাতে ভিটামিন-সি থাকে। তাহলেই করোনা প্রতিরোধ করা যাবে। কেউ আবার গরম জল খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান কী বলছে? বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর চন্দন ঘোষের মুখোমুখি হলেন সবুজ মুখোপাধ্য়ায়।

আরও পড়ুন- মারণ ভাইরাসের প্রকোপ থেকে কীভাবে বাঁচবেন অ্যাজমার রোগীরা, সতর্ক হোন এখনই

সবুজ--কীভাবে করোনার প্রতিরোধ করা যায়, তা নিয়ে বাজারে এখন অনেক গুজব। কোনটি ঠিক আর বেঠিক, তা বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। 

ডক্টর ঘোষ-- একদম ঠিক কথাই বলেছেন। লোকে কনফিউসড হয়ে যাচ্ছে। 

সবুজ-- হ্য়াঁ, সেই মাস্ক পরা নিয়ে শুরু হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত না-হলে একজন সুস্থ লোক কি মাস্ক পরবে কি পরবে না, তা নিয়ে তো একটা ভিডিও পর্যন্ত ভাইরাল হয়ে গেলো। কলকাতার একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক তাঁর সহকর্মীদের বললেন, আক্রান্তের কাছে না-গেলে মাস্ক পরার কোনও দরকার নেই। 

ডক্টর ঘোষ-- হ্য়াঁ, সেই ভিডিয়ো আমিও দেখেছি। পরে কিন্তু তা ভুল প্রমাণিত হলো। এমনকি রাজ্য় সরকার থেকে সরসরি বলে দেওয়া হলো, মাস্ক না-পরলে এবার ব্য়বস্থা নেওয়া হবে। আসলে আগ বাড়িয়ে বেশি কিছু বললেই বিপদ। কারণ, করোনা একটা নতুন রোগ। এ নিয়ে এখনও আমরা কিন্তু বেশি কিছু জানি না। 

সবুজ- এই প্রসঙ্গে আরও একটা কথা  বলতেই হয়। সবাই মিলে খুব লেবুর রস খাওয়া কথা বলছে। যেহেতু লেবুর রসে প্রচুর ভিটামিন-সি থাকে। একটা ভিডিয়োতে দেখলাম, সম্ভবত হাওড়ার কোনও এক থানার ওসি বলছেন কমলা লেবুর রস খেতে।  তাঁদের নাকি ট্রেনিংয়ে সেকথা বলা হয়েছে। 

ডক্টর ঘোষ-- তাই? খুবই চিন্তার কথা। কোভিড নিয়ে এত কথা বলা হচ্ছে কিছুই না-জেনেই কিন্তু। মেডিকেল সায়েন্স কিন্তু ফলের রসের সঙ্গে করোনার কোনও সম্পর্কের কথা এখনও জানতে পারেনি। অথচ...। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে অনেককেই বলতে শুনছি, করোনার সংক্রমণ আটকাতে লেবুর রস খান। কেউ আবার বলছেন, গরম জল খান। কেউ আবার ভিটামিন-ডি খাওয়ার কথাও বলছেন। কিছু মনে করবেন না, আমি এঁদেরকে বলি কোভিডিয়েটস। 

আরও পড়ুন- সবার দেহে পড়ছে না সমান প্রভাব, গবেষণায় জেরবার বিজ্ঞানীদের করোনার রহস্য জানতে এখন ভরসা ডিএনএ

সবুজ-- হাঃ হাঃ। ভালো বলেছেন। করোনা কতদূর অবধি ছড়াতে পারে, তা নিয়েও তো একটা বিতর্ক হয়ে গেলো।

ডক্টর ঘোষ-- হ্য়াঁ। প্রথমে বলা হচ্ছিল, করোনা নাকি এক মিটার অবধি ছড়ায়। আমরা কিন্তু পড়ে এসেছি, হাঁচিকাশিতে ড্রপলেট ছ-ফুট অবধি যায়। অথচ দেখুন, প্রথমে যখন এক মিটারের তত্ত্বটা দেওয়া হলো তখন কিন্তু সবাই বেশ খেয়ে নিলো। ইদানিং তত্ত্বটা পাল্টাতে শুরু করেছে। কালকেই আমাদের একজন শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক বললেন, ওটা ছ-ফুট হওয়া উচিত। কেউ কেউ আবার বলছেন ১৩ ফুট। তাহলে এক মিটারের তত্ব্চটা কতটা ভুল ছিলো এখন বুঝতেই পারছেন। এর আসল কারণটা হলো অজ্ঞতা।

সবুজ-- ফিরে আসি ভিটামিন-সি-র কথায়।  করোনা প্রতিরোধে ভিটামিন-সি-র ভূমিকা নিয়ে আপনি কী বলবেন?

ডক্টর ঘোষ-- আমি আবারও বলি, মেডিকেল সায়েন্স কিন্তু এখনও এমন কথা বলছে না যে, ভিটামিন-সি বেশি করে খেলেও করোনার হাত থাকে বাঁচা যায়। ভিটামিন-সি এমনিতে আপনি খেতেই পারেন। কেউ বারণ করছে না।   তবে তার সঙ্গে করোনার প্রতিরোধের সরাসরি  কোনও সম্পর্ক কিন্তু এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি মেডিকেল সায়েন্সে। 

সবুজ-- কিন্তু শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তো বাড়ে ভিটামিন-সি খেলে?

ডক্টর ঘোষ-- দেখুন, আমরা কিন্তু বিষয়টাকে ওইভাবে দেখি না। আপনি সুস্থ থাকবেন, সুস্থ জীবনযাপন করবেন, পুষ্টিকর খাবার খাবেন, এক্সারসাইজ করবেন, এই হচ্ছে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ঠিকঠাক রাখার চাবিকাঠি।  পুষ্টিকর খাবারের ভেতর ভিটামিন-সি-ও থাকবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি ভিটামিন-সি খেলেন আর আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রাতারাতি বেড়ে গেলো। 

সবুজ-- তাহলে লেবুর রস খাওয়ার দরকার নেই বলছেন?

ডক্টর ঘোষ-- দেখুন, এখন আমি এমন কিছুই বলবো না যে, দুদিন বাদে নিজের থুতু নিজেকেই গিলতে হয়। আমি শুধু বলবো, করোনার সম্পর্কে এখনও আমরা অনেক কম জানি। যদিও আশা রাখি, আর মাস ছয়েকের ভেতরেই জেনে যাবো আরও অনেক কিছুই। তখন না-হয় নির্দিষ্ট করে কিছু কথা বলা যাবে। তাই আবারও বলি, আমি কিন্তু ভিটামিন-সি খেতে বারণ করছি না। আমি শুধু বলছি, ফলের রস বা লেবুর রস, যাতে ভিটামিন-সি থাকে, তা নিয়ে একটা বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে কিছু না-জেনেই। এই জায়গাটায় আমার আপত্তি আছে।

আরও পড়ুন- রান্নাঘরে ব্যবহৃত এই জিনিসই হাজারো রোগের ওষুধ, জানুন এর বিশেষ গুণ

সবুজ-- বেশ, বুঝলাম। কিন্তু একটা কথা। করোনার মরশুমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাহলে কী করে বাড়ানো যেতে পারে?

ডক্টর ঘোষ--  সারা বছর যা করা উচিত এখনও তা-ই করা উচিত। এর চেয়ে অন্য় কিছু নয়। 

সবুজ-- যেমন?

ডক্টর ঘোষ-- যেমন আগেই বলেছি, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। অবশ্য়ই সাধ্য়মতো। সবুজ শাক-সবজি থেকে শুরু করে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন খেতে হবে। নিয়মিত কোনও-না-কোনও এক্সসারসাইজ করতে হবে। মনে রাখবেন, নিয়ম করে হাঁটাটাও কিন্তু একটা এক্সারসাইজ।  আর যেটা বলা দরকার, অলস জীবনযাত্রার থেকে দূরে থাকা দরকার।  আমাদের এই কমপিউটার শাসিত জীবনে সারাক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ করার যুগে, একটু শারীরিক পরিশ্রম করা দরকার। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম বা বিশ্রামও খুব জরুরি।  আর অবশ্য়ই স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে আপনাকে।