লকডাউনের বাজারে আমাদের মনমেজাজের খোঁজখবর দিলেন মনোবিদ আঁখি গুপ্তা। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন সবুজ মুখোপাধ্য়ায়।

সবুজ--চারপাশে মনের খবর কী বুঝছেন... এখন তো আর কেউ কাউনসেলিংয়ে আসতে পারছে না নিশ্চয়?

আঁখি--না তা পারছে না। তবে অনলাইনে কাউনসেলিং করতেই হচ্ছে। একটু যাদের ডেট পেরিয়ে যাচ্ছে, তারাই খুব অসুবিধেয় পড়়ছে। লকডাউনের বাজারে সমস্য়া বাড়ছে দেখছি। মনমেজাজ কাউর বিশেষ ভালো নেই।

সবুজ--আসলে বাড়িতে বসে বসে একটা একঘেয়েমি তো এসেই যাচ্ছে। আর যাদের একটু ডিপ্রেশনের ধাত, তাদের বোধহয় আরও বেড়ে যাচ্ছে...

আঁখি--হ্য়াঁ, এই বাড়ি বসে থাকা ব্য়াপারটা ট্রিগার করছে।

সবুজ--আচ্ছা, ধরুন যাদের ডিপ্রেশনের কোনও অতীত ইতিহাস নেই, তাদেরও কি মন খারাপ বাড়ছে?

আঁখি--এরকম আমি প্রচুর আননোন মেসেজ পাচ্ছি সোশাল মিডিয়ায়। অনেকেই বলছেন, খুব ভালো ছিলাম, এভরিথিং ওয়াজ রাইট, কিন্তু এখন হঠাৎ করে কেমন লাগছে... কেউ কেউ তো আবার ক্লসটোফোবিয়ার কথাও বলছেন।

সবুজ--ও, বুঝেছি, বাড়িতে থাকতে হচ্ছে তাই। বদ্ধ জায়গায় অনেকক্ষণ থাকতে হচ্ছে, তাই ক্লস্টোফোবিয়া... এ তো রীতিমতো চিন্তার বিষয়। আর কী দেখছেন?

আঁখি--দেখুন আমি যেভাবে বিষয়টাকে দেখছি, তা হল পিএটিডি (PATD)  প্য়ানিক, অ্য়াংজাইটি, ট্রমা, ডিপ্রেশন... প্রথমে একটু প্য়ানিক, তারপর অ্য়াংজাইটি, তারপর হালকা হলেও একটু ট্রমা আর তারও পর একেবারে শেষে ডিপ্রেশন... চিনেও কিন্তু একই অবস্থা হয়েছে...

সবুজ--কিন্তু চিনে তো অন্য়রকম ট্রমা। ওরা নিজেদের দেশের লোকদের মারা যেতে দেখছে, একে একে মৃ্ত্য়ুর সংখ্য়া বেড়ে চলেছে। সেই থেকে একটা ট্রমা। কিন্তু আমাদের এখানে  তো মৃ্ত্য়ুভয় খুব-একটা দেখছি না কাউর মধ্য়ে। আমাদের মতো মধ্য়বিত্তরা বরং অন্য় একটা সমস্য়ায় ভুগছি। একাকিত্ব। আর তার মাঝেই দেখছি কেউ ফেসবুকে রান্নার ছবি পোস্ট করছেন। কেউ কিঞ্চিৎ ইয়ার্টি ঠাট্টাও মারছেন। কেউ বা বাকিদের বাড়িতে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। কেউ বাব মোদি-মমতা নিয়ে পোস্ট করছেন।

আঁখি--একদম ঠিক কথা বলেছেন। মৃত্য়ুভয় কিন্তু এখনও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না আমাদের মধ্য়ে। আমাদের ভয়টা অন্য় জায়গায়। এই যে নিউক্লিয়ার ফ্য়ামিলি, টু-রুম ফ্ল্য়াট তাতেই হচ্ছে সমস্য়া। এই যে সন্ধেবেলায় কী করব। সকালবেলায় কী করব। এই যে ক্লকটা চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে, তাতেই আমাদের সমস্য়া হচ্ছে। কেউ আবার ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছে।

সবুজ--তবে ওয়ার্ক ফ্রম হোমেও একটা বোরডাম  আসছে। অফিস কলিগদের সঙ্গে দেখা নেই, গল্প নেই, চা-খেতে বেরনো নেই। এটাও একটা সমস্য়া।

আঁখি--তা তো বটেই। ব্য়াপারটা কী হচ্ছে, আমি বাড়ি থেকে না-বেরিয়েই কাজ করছি এটা এক জিনিস। আর বাড়ি থেকে বেরোতেই পারছি না, তাই বাধ্য় হয়ে বাড়ি বসে কাজ করছি, সেটা কিন্তু আরেক জিনিস। আরও কুড়িদিন কীভাবে কাটাবো এভাবে, এই ভাবনা সবসময়ে। আমি কিন্তু প্রচুর মেল পাচ্ছি। এই বাড়িতে থেকে কী করব, এই সবুজ--প্রশ্নটা কিন্তু খুব কমন। সবাই ওই একই জায়গাটায় জোর দিচ্ছে। গৃহবন্দি হওয়া। মরার ভয় যত-না, তার চেয়ে বেশি ভয় এই গৃহবন্দি অবস্থা নিয়ে।

আঁখি--ঠিকই বলেছেন।  মৃত্য়ুভয়ের চেয়ে অনেক বেশি ভয় এই বন্দিদশা নিয়ে।

সবুজ--তবে দিনকয়েক পরে বোধহয় শুরু হবে অন্য় সমস্য়া আর অন্ন সমস্য়া। একে মাসের শেষ। সবার মাইনে তো আর অনলাইনে অ্য়াকাউন্টে ঢুকে পড়ে না। তাই  মধ্য়বিত্তের যেটুকু যা মজুদ, তা শেষ হয়ে গেলেই টান পড়বে পকেটে। তখন এক অন্য় দুশ্চিন্তা।

আঁখি--সেটা ঠিকই। সেই পরিস্থিতিতে, ক-দিন ইএমআই না-দিলেও চলবে, বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া বাকি রাখতে রাজি হবেন কিনা, পাড়ার চেনা মুদির দোকান ধারে চাল-ডাল দেবে কিনা, সব কিছুই তখন খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।... তবে আর একটা বিষয় লক্ষ করছি।

সবুজ--কী?

আঁখি--মায়েদের খুব চিন্তা বেড়ে গিয়েছে এখন। বিশেষ করে যেসব বাড়িতে বাচ্চারা রয়েছে বা টিনএজাররা রয়েছে।  বাবা বাজার থেকে এলেই তাকে বারবার হাত ধোয়ার জন্য় বলা। বাবা কিন্তু এমনিতেই হাত ধুচ্ছেন। তা-ও। আবার ধরুন, বাড়ির কাউর একটু হাঁচিকাশি হল তো চরম দুশ্চিন্তা। এই রে, ওর  থেকে আমার বাচ্চার হবে না তো। হাইজিন নিয়ে এখন হালকা হলেও একটা প্য়ানিক কাজ করছে কিন্তু।

সবুজ--এই সময়ে তো তাহলে ওসিডির পেশেন্টদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাবে। বিশেষ করে এমনিতেও যাদের বারবার হাত ধোয়ার সমস্য়া রয়েছে।

আঁখি--একদম ঠিক। যাদের এই রোগ এখন একটু কমের দিকে, তাদের আবার বাড়বার সম্ভাবনা রয়েছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সব জায়গায় এখন হাত ধোয়ার কথা বলা হচ্ছে। টিভিতে বলুন, সোশাল  মিডিয়ার বলুন। এইটা কিন্তু ওসিডির পেশেন্টদের আবার ট্রিগার করছে।

সবুজ--তাই? আর যারা ডিপ্রেশনের পেশেন্ট, বা যাদের ডিপ্রেশনের একটা পাস্ট হিস্ট্রি রয়েছে, তাদের কী অবস্থা দেখছেন?

আঁখি--আমি যাদের কাউনসেলিং করি, তাদের হালকা হলেও বাড়ছে, নয়তো ইমপ্রুভ করছে না। এক্সটার্নার ফ্য়াকটারগুলোকে তারা তো নিতে পারে না।  তাই। তবে আমরা অন্য়ধরনের অনেক কিছু করার কথা বলছি।

সবুজ--যেমন?

আঁখি--ধরুন, হাঁটা। হাঁটলে কিন্তু শরীরে এনডরফিন লেভেলটা বাড়ে। তাতে করে মনমেজাজ ভালো থাকে।

সবুজ--কিন্তু একন হাঁটতে বেরুবো কোথায়?

আঁখি--বেরনো সম্ভব না-হলে যোগা বা ফ্রি হ্য়ান্ড। নিদেন পক্ষে বেসিক স্ট্রেচিং। অন্তত একটু হাত-পা ছড়ানো।...

সবুজ--আচ্ছা, যারা একটু দুশ্চিন্তাপ্রবণ হয়, তাদের তো এই সময়ে উদ্বেগ বেড়ে চলবে?

আঁখি--তা তো বটেই। আমি তো তেমন অনেককেই দেখলাম এই ক-দিনে। মিডিয়ার অনবরত এই নিয়ে খবর হচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্য়া বাড়ছে। মৃতের সংখ্য়া বাড়ছে। আর তাই দেখে বেড়ে চলেছে দুশ্চিন্তা।

সবুজ--কিন্তু সে ক্ষেত্রে করার কী আছে?

আঁখি--আমি বলবো টিভি দেখার সময়টা একটু কমিয়ে ফেলা। দেখতে বারণ করছি না। কিন্তু যতটা সম্ভব কমানো যায় আর কী। স্ক্রিন শেয়ারিং বা  সোশাল সাইটে সময় কাটানোও কিন্তু একটু কমাতে হবে। সেখানেও কিন্তু এই ধরনের নেগেটিভ খবর রয়েছে খুবই। এতে করে কী হয়, সাবকনশাস মাইন্ডে বারবার ওই মেসেজগুলো যাচ্ছে।... আসলে কী জানেন, এনভায়রনমেন্টালি না-হলেও মেন্টালি আমরা অনবরত ইনফেকটেড হয়ে চলেছি।

সবুজ--সেক্ষেত্রে  উপায় কী?  ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে তো বই পড়া তো এখন একশো বছরের পুরনো অভ্য়েসে পরিণত হয়েছে।

আঁখি--দেখুন বই পড়তে পারলে তো ভালোই। আর তা যদি না-ও সম্ভব হয় ক্রিয়েটিভ অনেককিছু করা যায়। যেমন ধরুন গার্ডেনিং, কুকিং, তারপর ধরুন লেখালেখি করা। করে পোস্ট করা। যেমন আমারই একজন  কাউনসেলি, ও খুব ভালো ছবি আঁকতো। তা এই গৃহবন্দি অবস্থায় আবার ছবি আঁকতে শুরু করেছে। দেখুন, আমাদের প্রত্য়েকেরই কোনও না কোনও প্য়াশন রয়েছে। হবি রয়েছে। সেগুলোকেই একটু প্রশ্রয় দেওয়া যাক না এই সময়ে। তবে সারাক্ষণ ফোন নিয়ে ঘাঁটলে কিন্তু হবে না। সেটা কিন্তু কোনও ক্রিয়েটিভ কিছু নয়।

সবুজ--ঠিকই । এখন তো ফেসবুকের সৌজন্য়ে লিখে বা এঁকে সহজেই পোস্ট করা যায়।  তাই হবিগুলোকে...

আঁখি--হ্য়াঁ। শুধু লেখা বা আঁকাই নয়। গার্ডেনিং বা কুকিংও রয়েছে। তারপর ধরুন, পুরনো জিনিস ঘেঁটে দেখা। ধরুন পুরনো একটা ডায়েরি বের করলাম। পুরনো কোনও অ্য়ালবাম দেখলাম। এমনিতে কিন্তু এগুলো দেখা হয় না। হয় সময় থাকে না নয় ক্লান্তি এসে যায়। এই সময়ে কিন্তু এগুলোও বেশ ইনভলভ রাখতে পারবে আপনাকে। ধরুন, ঘরের কোনায় ওয়ার্ডবটা বা আলমারিটা একটু গোছাবো। অনেকদিন সেখানে হাত দেওয়া হয়নি।... দেখুন অপশনটা আমার কাছেই রয়েছি। আমি ফেসবুকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে সারাক্ষণ প্রতিবাদ করে  কাটাতে পারি। অথবা এই ছোট ছোট জিনিসগুলো করে কিন্তু কুড়িদিন আরামসে কাটিয়ে দিতে পারি।