প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) একটি নতুন লং রেঞ্জ ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইলের (LRLACM) সফল পরীক্ষা করেছে। ওড়িশার চাঁদিপুর থেকে ছোঁড়া এই মিসাইলটি ১০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানে। এটিকে আমেরিকার বিখ্যাত টমাহক মিসাইলের ভারতীয় সংস্করণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
Long Range Land Attack Cruise Missile: 'নির্ভয়' ক্রুজ মিসাইল প্রকল্পে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার পর, অবশেষে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO)-র হাতে বড়সড় সাফল্য এল। গত ১৫ জুন ওড়িশার চাঁদিপুরে অবস্থিত ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট রেঞ্জ (ITR) থেকে DRDO ভারতের নতুন লং রেঞ্জ ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল (LRLACM)-এর প্রথম সফল পরীক্ষা করে।

যদিও এই মিসাইলটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ এখনও করা হয়নি, তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা এটিকে আমেরিকার বিখ্যাত টমাহক সাবসনিক ক্রুজ মিসাইলের ভারতীয় সংস্করণ হিসেবেই দেখছেন। পরীক্ষার সময় মিসাইলটি ১০০০ কিলোমিটার দূরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে একেবারে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।
LRLACM মিসাইলের বিশেষত্ব কী?
প্রতিরক্ষা আধিকারিকদের মতে, এই নতুন ক্রুজ মিসাইলটি আসলে আগের 'নির্ভয়' প্রকল্পেরই একটি উন্নত সংস্করণ। তবে এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বদল আনা হয়েছে। নতুন মিসাইলটির পাল্লা আগের চেয়ে বেশি এবং এর গাইডেন্স সিস্টেমও অনেক উন্নত করা হয়েছে। এছাড়াও, এটিকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে লঞ্চ করা যাবে, যা এর ব্যবহারিক ক্ষমতা অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে। মনে করা হচ্ছে, আগামী দু'বছরের মধ্যে আরও দুটি ডেভেলপমেন্ট ট্রায়াল এবং দুটি ইউজার ট্রায়াল হবে। তারপরই এটিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
১০০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম
DRDO তাদের আনুষ্ঠানিক প্রেস রিলিজে এই মিসাইলের বিস্তারিত প্রযুক্তিগত তথ্য জানায়নি। তবে যা জানা যাচ্ছে, সেই অনুযায়ী এটি একটি সাবসনিক ক্রুজ মিসাইল, যা প্রায় ০.৮ ম্যাক গতিতে উড়তে পারে। এই মিসাইলটি মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে গিয়ে ১০০০ কিলোমিটারের বেশি দূরে থাকা টার্গেটে হামলা চালাতে পারে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, খুব নিচু দিয়ে ওড়ার কারণে শত্রুপক্ষের র্যাডার সিস্টেমের পক্ষে একে খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব।
শত্রুর র্যাডারকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা
নতুন LRLACM মিসাইলটিকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এটি লো-ফ্লাইং প্রোফাইল বজায় রেখে লক্ষ্যের দিকে এগোতে পারে। এই কারণেই শত্রুপক্ষের এয়ার ডিফেন্স এবং র্যাডার সিস্টেমের জন্য একে ট্র্যাক করা খুব কঠিন হয়ে যায়। জানা যাচ্ছে, এই মিসাইলটি প্রায় ৫০০ কিলোগ্রাম ওজনের ওয়ারহেড বা বিস্ফোরক বহন করতে পারে, যা লক্ষ্যবস্তুকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
পাকিস্তান ও চিনের তুলনায় ভারতের নতুন শক্তি
ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির কাছে আগে থেকেই দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইল রয়েছে। যেমন, পাকিস্তানের কাছে ২০১০ সাল থেকে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার পাল্লার 'বাবর' ক্রুজ মিসাইল আছে, যার নামকরণ করা হয়েছে মুঘল শাসক বাবরের নামে। অন্যদিকে, চিনের হাতে বিভিন্ন ধরনের পারমাণবিক এবং সাধারণ ক্রুজ মিসাইল রয়েছে, যা তাদের সামরিক শক্তির একটি বড় অংশ।
আধুনিক যুদ্ধে ক্রুজ মিসাইলের গুরুত্ব বাড়ছে কেন?
এখনকার যুদ্ধের কৌশল খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক সেনাবাহিনী এখন 'স্ট্যান্ড-অফ ওয়েপনস'-এর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। অর্থাৎ, এমন অস্ত্র যা নিরাপদ দূরত্ব থেকে শত্রুর ওপর হামলা চালাতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য নিজেদের মিসাইল ক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল এবং আধুনিক রকেট সিস্টেম ভবিষ্যতের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
ভারতীয় সেনার শক্তি বাড়াবে এই নতুন মিসাইল
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নতুন লং রেঞ্জ ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল ভারতীয় সেনাবাহিনীর আক্রমণ করার ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। ভবিষ্যতে এই মিসাইল সেনার রকেট রেজিমেন্টের অংশ হতে পারে। এর মাধ্যমে ভারতীয় সেনা কঠিন পরিস্থিতিতেও চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) এবং অন্যান্য সম্ভাব্য বিপদের মোকাবিলা করতে আরও বেশি সক্ষম হবে।


