তপন মল্লিক

কেন্দ্রের নতুন তিন কৃষি আইন  বাতিলের দাবিতে দিল্লিতে কৃষকদের বিক্ষোভ আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। কৃষকদের সঙ্গে একাধিক বার আলোচনায় বসেও কেন্দ্র কোনও রফাসূত্র বের করতে পারেনি। কৃষকরা সরকারের সঙ্গে কোনও সমঝোতায় না গিয়ে তাদের দাবিতে অনড় থাকায় সারা দেশের অন্যান্য কৃষক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, রাজনৈতিক দল বিক্ষোভরত কৃষকদের সমর্থন জানিয়েছে। কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে মঙ্গলবার ভারত বন্‌ধের ডাক দিয়েছেন কৃষকরা। ইতিমধ্যেই সেই বনধকে সমর্থন জানিয়েছে ১০টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন ছাড়াও কংগ্রেস, আপ, টিআরএস, এনসিপি এবং বামপন্থী দলগুলি। গুজরাতের গান্ধীনগরে প্রতীকী অনশনে যোগ দিয়েছেন কংগ্রেস কর্মীরা।
হরিয়ানা-দিল্লির সিংঘু সীমানায় আন্দোলমকারী কৃষকদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বক্সার বিজেন্দ্র সিং। এখানে গত ১১তম দিন ধরে কৃষকরা আন্দোলনে সামিল।  তিনি আইন প্রত্যাহার না হলে সর্বোচ্চ ক্রীড়া সম্মান রাজীব গান্ধী খেল রত্ন ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। এনসিপি প্রধান ও প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী শরদ পাওয়ার কেন্দ্রের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন,  এর পরে কৃষকদের বিক্ষোভ শুধু দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। অন্যদিকে, শিবসেনা শিরোমণি অকালি দলের নেতৃত্বকে সমর্থন জানিয়ে দিল্লিতে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। 


বোঝা যাচ্ছে মোদী সরকারের পক্ষে চলতি বছরটা সুখের হল না। দেশ একের পর এক বিলের সংশোধনি ঘিরে উত্তাল। বছরের শুরুতেই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছিল দেশ। সেই বিক্ষোভ চাপা পরে করোনার ধাক্কায়। কিন্তু বছরের শেষে ফের নতুন কৃষিবিল ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছে খোদ রাজধানীর আশপাশ। যার আঁচ ছড়িয়ে গিয়েছে গোটা দেশে। সিএএ বিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ফোকাস পেয়েছিল শহিনবাগ। দিল্লির বিধানসভা ভোটেও শাহিনবাগের প্রভাব পড়েছিল। করোনার আগে সিএএ-র প্রতিবাদে টানা ১০দিন ধরে দাঙ্গা চলে দিল্লিতে।। দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে ধাক্কা খায় বিজেপি। ফের ক্ষমতায় ফেরে আম আদমি সরকার। 


করোনা একটু ঝিমিয়ে পড়তেই কৃষি বিলের নতুন সংশোধনী পাস করে মোদী সরকার। রাজ্যসভায় বিল পেশের আগেই মোদী সরকারের হাত ছাড়ে শিরোমণি অকালি দল। পদত্যাগ করেন অকালি দলের মন্ত্রী হরসিমরত কউর। কৃষি আইনের বিরোধিতায় বিক্ষোভ শুরু হয় পাঞ্জাবে। এরপর উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্র কৃষি আইনের প্রতিবাদে পথে নামেন কৃষকরা। কেন্দ্র ৫ দফা বৈঠক করেছে। কোনও সুরাহা হয়নি। কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে অনড় কৃষকরা। গত সপ্তাহে উত্তরাঞ্চলের পাঞ্জাব ও হরিয়ানার হাজার হাজার কৃষক জড়ো হয়েছেন রাজধানীতে। দিল্লিতে ঢোকার আগেই তাদের পুলিশি বাঁধার মুখে পড়তে হয়। তবে গত ১১ দিন ধরে তারা দিল্লির সঙ্গে পাঞ্জাব ও হারিয়ানার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। 


দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল আজ আন্দোলনরত কৃষকদের সঙ্গে দেখা করতে সিঙ্ঘু যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি কৃষকদের ডাকা মঙ্গলবারের বনধকেও সমর্থন জানিয়েছেন। তার আগে আন্দোলনরত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে বিক্ষোভকারী কৃষকদের পাশে থাকার বার্তা দেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের রাজ্যসভা সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনকে তিনি হরিয়ানায় পাঠিয়েছেন। কৃষকদের সমর্থনে খেলরত্ন পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলেন ভারতের তারকা বক্সার বিজেন্দ্র সিং। এর আগে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার একাধিক ক্রীড়াবিদ অর্জুন পুরস্কার ফেরৎ দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। কৃষক আন্দোলনে নরেন্দ্র মোদী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। তারা কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে কৃষকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে। আন্দোলনকারী কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গিয়েছিল কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে। তাঁর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে দিল্লি। বিষয়টি নিয়ে ভারতে কানাডার হাইকমিশনারকেও তলব করা হয়। তার পরেও নিজের মন্তব্য থেকে একচুল সরেননি ট্রুডো।
কৃষকদের অবস্থান বিক্ষোভের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আজ কিন্তু বিরোধী শিবিরের দলগুলিকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে এই আন্দোলন। লোকসভা নির্বাচনের পরে এই প্রথম ১৫টি রাজনৈতিক দল এক সুরে কৃষকদের বন্‌ধকে সমর্থন করেছে। কাশ্মীরের ৩৭০ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব আইন নিয়েও বিরোধী দলগুলি তাদের ভিন্ন ভিন্ন মতের কারণে এক জায়গায় আসতে পারেনি। কিন্তু কৃষকদের আন্দোলন নিয়ে কোনও দল এখনও পর্যন্ত ভিন্ন মত সামনে এনে দূরে সড়ে থাকতে পারেনি। প্রায় সবাই এক সুরে সরব হয়েছে। কৃষকরা রাজনৈতিক দলগুলিকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে শর্ত;  নিজেদের দলের পতাকা ফেলে কৃষকদের পতাকার তলায় দাঁড়িয়ে আন্দোলনে শামিল হতে হবে। তাতেও চাপে পড়েছে মোদী সরকার।