ভারতীয় রেল এক নতুন ইতিহাস গড়ল। হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রুটে দেশের প্রথম গ্রিন হাইড্রোজেন চালিত ট্রেনের সফল ট্রায়াল রান হয়ে গেল। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই পরিবেশবান্ধব ট্রেনটি কার্বন ডাই অক্সাইডের বদলে শুধুমাত্র জল ও বাষ্প নির্গত করে, যা দূষণহীন পরিবহণের ক্ষেত্রে এক বিরাট পদক্ষেপ।

নয়া দিল্লি: ভারতীয় রেলের ইতিহাসে একটা নতুন মাইলফলক তৈরি হল। দূষণমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে এক বড় পদক্ষেপ নিয়ে দেশের প্রথম ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’ চালিত ট্রেন হরিয়ানার ট্র্যাকে সফলভাবে দৌড়ল। নয়া দিল্লি এবং হরিয়ানার জিন্দ-এর মধ্যে এই ট্রায়াল রানের সময় ট্রেনটির এমার্জেন্সি ব্রেকিং সিস্টেম এবং устойчивость (stability) পরীক্ষা করা হয়, যা সম্পূর্ণ সফল হয়েছে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য এই ট্রেনটিকে তৈরি করার পথে রেলের এটা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

ঘণ্টায় ১২০ কিমি গতিতে দৌড়ল ট্রেন!

২৬ জুন হরিয়ানার জিন্দ-সোনিপত রুটে এই ঐতিহাসিক ট্রায়াল রান হয়। এই সময় ট্রেনটি সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছয়, যা এর অসাধারণ ক্ষমতার প্রমাণ। তবে, ভবিষ্যতে যাত্রীদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এর সাধারণ গতি ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার রাখা হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে। সম্প্রতি রেলওয়ে বোর্ড এই ১০ কোচের ট্রেনটিকে সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে এবং খুব শীঘ্রই এটি সাধারণ মানুষের পরিষেবার জন্য চালু হবে। এই সাফল্যের সঙ্গে ভারত अब আমেরিকা, জার্মানি, জাপান এবং চিনের মতো শক্তিশালী দেশগুলির তালিকায় গর্বের সঙ্গে যোগ দিল।

হাইড্রোজেন ট্রেন কীভাবে কাজ করে?

এই ট্রেনের প্রযুক্তি বেশ আকর্ষণীয়। ট্রেনটি চলার জন্য বাইরে থেকে কোনও বিদ্যুতের লাইন (ওভারহেড কেবল) বা ডিজেল ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয় না। এটি নিজের বিদ্যুৎ নিজেই তৈরি করে!

১. বর্তমানে চালু থাকা ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (DEMU) ট্রেনকেই বদলে তাতে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল (Hydrogen Fuel Cells) বসানো হয়েছে।

২. ট্রেনে মজুত হাইড্রোজেনকে বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে মিশিয়ে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়।

৩. এই রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে যে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তা দিয়েই ট্রেনের মোটরগুলি চলে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোনও কার্বন ডাই অক্সাইড বা বিষাক্ত ধোঁয়া বের হয় না। এর বদলে শুধুমাত্র জল এবং বাষ্প পরিবেশে নির্গত হয়!

দেশীয় প্রযুক্তি এবং হাইড্রোজেন ভরার ব্যবস্থা

এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটি হায়দ্রাবাদের সংস্থা মেধা সার্ভো ড্রাইভস (Medha Servo Drives), কানাডার ব্যালার্ড পাওয়ার সিস্টেমস (Ballard Power Systems) কোম্পানির সঙ্গে মিলে সম্পূর্ণ দেশীয় মডেলে তৈরি করেছে।

হরিয়ানার জিন্দ-এ দেশের প্রথম হাইড্রোজেন স্টোরেজ এবং রিফুয়েলিং স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। এই ইউনিটে প্রতিদিন ৪২০ থেকে ৪৩০ কেজি হাইড্রোজেন তৈরি করে ট্রেনে ভরা হবে।

একবার পুরোপুরি জ্বালানি ভরা হলে এই ট্রেনটি প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবে। ট্রেনের দুই প্রান্তেই হাইড্রোজেন চেম্বার রয়েছে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের জন্য ব্যাটারির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

জ্বালানি ভরার পুরো ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ২৪/৭ প্রশিক্ষিত এবং সার্টিফায়েড কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। ট্রেনটির প্রাথমিক দৌড়ের সময় যাতে কোনও প্রযুক্তিগত সমস্যা না হয়, তার জন্য বিশেষজ্ঞরা ট্রেনের মধ্যেই থাকবেন।

প্রকল্পের খরচ এবং ভবিষ্যতের লক্ষ্য

এই প্রযুক্তি শুরুতে বেশ ব্যয়বহুল মনে হলেও ভবিষ্যতের জন্য এটি অত্যন্ত লাভজনক। বর্তমান হিসেব অনুযায়ী, প্রতিটি ট্রেন তৈরির খরচ প্রায় ৮০ কোটি টাকা এবং পরিকাঠামোর খরচ প্রায় ৭০ কোটি টাকা।

ভারত সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ২০৩০ সালের ক্লিন এনার্জি লক্ষ্য এবং ‘নেট জিরো’ (Net Zero) কার্বন নিঃসরণ অর্জনের পথে এই হাইড্রোজেন ট্রেন প্রকল্পটি একটি দিশা দেখাবে। ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যা এবং জ্বালানির চাহিদার দেশে, পরিবেশের কোনও ক্ষতি না করা এই সহজ প্রযুক্তি প্রকৃতির এক আশীর্বাদের মতোই। সস্তায় পরিবেশবান্ধব যাত্রী ও পণ্য পরিবহণে এটি আগামী দিনে এক নতুন বিপ্লব আনবে।