বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে দাবি করেছেন, পাক অধিকৃত কাশ্মীরের পাশাপাশি এবার নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর এবং সিলেটও ভারতের ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। তাঁর অভিযোগ, জওহরলাল নেহরু জোর করে এই এলাকাগুলো দিয়ে দিয়েছিলেন।

বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে শুক্রবার বলেছেন, পাক অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) পাশাপাশি এবার নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর এবং সিলেট অঞ্চলও ভারতের 'পুনরুদ্ধার' করার সময় এসেছে। তাঁর দাবি, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু জোর করে এই এলাকাগুলো হস্তান্তর করেছিলেন। দুবে জানান, এই তিনটি এলাকাই একসময় টিপরা রাজ্যের অংশ ছিল।

এএনআই-কে দুবে বলেন, "পাকিস্তান থেকে শুধু পাক অধিকৃত কাশ্মীর ফিরিয়ে আনার সময় আসেনি। নেহরুজি জোর করে যে এলাকাগুলো দিয়ে দিয়েছিলেন, তা সে নোয়াখালি হোক, চট্টগ্রাম বন্দর বা সিলেট—সেগুলোও এবার ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে।" এই বিজেপি নেতার দাবি, ত্রিপুরার তৎকালীন রাজা বীর বিক্রম সিং নিজের এলাকা নিয়ে নেহরুর 'সমঝোতা' করার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। নিশিকান্ত দুবে বলেন, "নোয়াখালি, সিলেট এবং চট্টগ্রাম বন্দর—এই তিনটি এলাকাই টিপরা রাজ্যের অংশ ছিল। ত্রিপুরার আগের নাম ছিল টিপরা। ওখানকার রাজা বীর বিক্রম সিং নেহরুর সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই করছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁর এলাকা নিয়ে নেহরু কীভাবে দরাদরি করতে পারেন? তিনি বলতেন: আপনি কীভাবে নোয়াখালি পাকিস্তানকে দিতে পারেন? সিলেটে কীভাবে গণভোট করতে পারেন? চট্টগ্রামে কীভাবে গণভোট করতে পারেন? এটা আমার রাজ্য। এটা ভারতের অংশ থাকবে, পাকিস্তানে যাবে নাকি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, সেই সিদ্ধান্ত আমি নেব।"

তিনি আরও বলেন, "সর্দার প্যাটেল সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন। এরপর ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ত্রিপুরা ভারতের অংশ হয়। মহারানি কাঞ্চন প্রভা ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে চুক্তিপত্রে (ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন) সই করেন, যার ফলে ত্রিপুরা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।"

নেহেরুজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য় মরিয়া ছিলেন: নিশিকান্ত দুবে

নিশিকান্ত দুবের অভিযোগ, ১৯৪৬ সালে নোয়াখালিতে হিন্দুদের ওপর হওয়া হিংসার জবাব দেওয়ার চেয়ে মুসলিম লিগকে নিজের সরকারে আনাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন পণ্ডিত নেহরু। তাঁর দাবি, ওই গণহত্যায় প্রায় ১০ হাজার হিন্দুকে খুন করা হয়েছিল।

বিজেপি সাংসদ বলেন, "নেহরুজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য মরিয়া ছিলেন। ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হয়, কিন্তু তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী হননি। তিনি ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই মুসলিম লিগ ডাইরেক্ট অ্যাকশন শুরু করে।" তিনি আরও বলেন, "১৯৪৬ সালের ১৫ অক্টোবর হিন্দু অধ্যুষিত নোয়াখালিতে হিন্দুদের ওপর এক বিশাল গণহত্যা চালানো হয়। একদিনেই প্রায় ১০ হাজার হিন্দুকে খুন করা হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সেখানে যাননি। মুসলিম লিগ কীভাবে তাঁর সরকারের অংশ হতে পারে, তা নিয়েই তিনি বেশি চিন্তিত ছিলেন।"

লোকসান ভারতের!

নিশিকান্ত দুবে আরও জানান, চট্টগ্রাম বন্দর হাতছাড়া হওয়ার কারণেই গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন থমকে গিয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, "চট্টগ্রাম বন্দর চলে যাওয়ার কারণেই গোটা উত্তর-পূর্বের উন্নয়ন থমকে যায়। আজ যদি উত্তর-পূর্বকে পিছিয়ে পড়া মনে হয়, যদি সেখানে সমস্যা থাকে, যদি আমরা সেখানকার খনি, খনিজ এবং গ্যাস পুরোপুরি ব্যবহার করতে না পারি, আর যদি ওই অঞ্চলটি এখনও বিচ্ছিন্ন মনে হয়, তবে তার একমাত্র কারণ হলো আমাদের কাছে আর ওই বন্দরটি নেই। চট্টগ্রাম, নোয়াখালি এবং সিলেটও ফিরিয়ে আনার এটাই সঠিক সময়।"

নিশিকান্ত দুবে বলেন, যে ব্যক্তি (বাহারুল ইসলাম) সিলেটে গণভোট পরিচালনা করেছিলেন, কংগ্রেস তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদ করেছিল। দুবে বলেন, "নেহরুজি যে কোনও উপায়ে প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে ত্রিপুরার রাজা বা মহারানি যখন ভারতের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে ত্রিপুরায় এক বছর ধরে লড়াই চলে, তখন আপনি কীভাবে চট্টগ্রাম, নোয়াখালি এবং সিলেটের মতো হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলো পাকিস্তানকে (যা এখন বাংলাদেশ) দিয়ে দিতে পারেন? আপনাকে এই অধিকার কে দিয়েছিল?"

তিনি বলেন, "যিনি সিলেটে গণভোট করেছিলেন—আপনারা কি বাহারুল ইসলামকে চেনেন? কংগ্রেস তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদ করেছিল। রাজ্যসভা ছাড়ার পর তাঁকে হাইকোর্টের বিচারপতি করা হয়। হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে অবসর নেওয়ার পর তাঁকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসর নেওয়ার পর কংগ্রেস তাঁকে আবার রাজ্যসভার সাংসদ করে।"

দুবে জানান, বাহারুল ইসলাম মুসলিম লিগের রেড আর্মির সদস্য ছিলেন। এই রেড আর্মি নোয়াখালি গণহত্যায় জড়িত ছিল এবং চট্টগ্রাম দখল ও সিলেটে গণভোট করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিয়েছিল।

ইতিহাস সংশোধন করার সময়: নিশিকান্ত দুবে

নিশিকান্ত দুবে বলেন, "এখন ইতিহাস সংশোধন করার সময়। ঠিক যেমন পাক অধিকৃত কাশ্মীর পাকিস্তানের দখলে রয়েছে এবং তা ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে, তেমনই উত্তর-পূর্বের চট্টগ্রাম বন্দর, সিলেট এবং নোয়াখালি ফিরিয়ে আনারও সময় এসে গেছে।" তাঁর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন টিপরা মোথা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা অভিযোগ করেছেন যে, "দেশভাগের সময় আমার ঠাকুমাকে অন্ধকারে রেখে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের বিশাল অংশ পূর্ব পাকিস্তানকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এটা আমাদের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়।"

ত্রিপুরার রাজপরিবারের প্রধান প্রদ্যোত মাণিক্য এক্সে (X) পোস্ট করে লেখেন, "আজ যদি আমাদের সমুদ্রপথের নাগাল থাকত, তবে চিকেনস নেক নিয়ে আমাদের আর চিন্তা করতে হতো না। তৎকালীন ভারত সরকারের এই কৌশলগত ভুলের মাশুল শুধু ত্রিপুরা বা উত্তর-পূর্ব নয়, গোটা দেশকেই চোকাতে হয়েছে। আমাদের গ্রেটার টিপ্রাল্যান্ড আন্দোলনকে প্রায়ই বদনাম করা হয়, কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য সবসময়ই ছিল অতীতের ঐতিহাসিক ভুলের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশগুলোকে আবার জুড়ে নেওয়া।"