সোমবার থেকে সংসদের বাদল অধিবেশন। অধিবেশন শুরুর আগেই তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদকে নিয়ে তৈরি হওয়া নতুন দল NCPI-কে সর্বদলীয় বৈঠকে ডাকা নিয়ে তুমুল বিতর্ক। অধিবেশনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সংখ্যা বৃদ্ধি, FCRA এবং শিক্ষা সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশ হতে পারে।

সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে সংসদের বাদল অধিবেশন। আর শুরুতেই একাধিক ইস্যুতে কেন্দ্র ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে জোরদার সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ১৩ অগাস্ট পর্যন্ত এই অধিবেশন চলবে। এবারের অধিবেশনে প্রথমবার অংশ নিতে চলেছে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI)। সম্প্রতি তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ এই দলটি তৈরি করে NDA জোটে যোগ দিয়েছেন।

বাদল অধিবেশন শুরু কাল থেকে

অধিবেশন শুরুর আগে সোমবার সংসদ ভবনের হংস দ্বারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর আগে, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা বিজনেস অ্যাডভাইসরি কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা আসন্ন অধিবেশনের আলোচ্যসূচি এবং বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। স্পিকার একটি ফলপ্রসূ অধিবেশনের জন্য গঠনমূলক বিতর্ক এবং সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও বাদল অধিবেশন নিয়ে নয়াদিল্লিতে সংসদ ভবন কমপ্লেক্সে একটি সর্বদলীয় বৈঠকের আয়োজন করেন। এই বৈঠকে ৪০টি রাজনৈতিক দলের ৫৮ জন নেতা অংশ নেন।

বাদল অধিবেশনের কর্মসূচি

কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, ১৬ জুলাই সংসদের বুলেটিনে এই অধিবেশনের আইনি কর্মসূচির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ২৫ দিন ধরে চলা এই অধিবেশনে মোট ১৯টি বৈঠক হবে।

বিরোধীদের ওয়াকআউট

তবে কেন্দ্রের ডাকা সর্বদলীয় বৈঠক থেকে বিরোধী দলগুলো প্রতীকী ওয়াকআউট করে। ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়াকে (NCPI) বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতিবাদেই তারা বেরিয়ে যায়। যদিও কয়েক মিনিট পরেই তারা আবার আলোচনায় যোগ দেয়।

লোকসভায় তৃণমূলের দুই পক্ষ

প্রসঙ্গত, লোকসভার স্পিকার তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা করার অনুমতি দিয়েছেন, যারা NCPI-এর সঙ্গে মিশে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।

কিরেন রিজিজু বলেন, বিরোধীদের এই ওয়াকআউটকে বয়কট হিসেবে দেখা উচিত নয়, কারণ এটি ছিল প্রতীকী। বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "এটাকে সারাদিনের কার্যক্রম বয়কট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; এটা ছিল প্রতীকী।"

কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলো NCPI-এর অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে। তাদের দাবি, এই দলটি আসলে তৃণমূলের ২০ জন "বিদ্রোহী" সাংসদের জন্য একটি "পার্কিং প্লেস", যাদের সদস্যপদের বিষয়ে স্পিকার এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

কংগ্রেসের সমালোচনা

কংগ্রেসের বরিষ্ঠ নেতা জয়রাম রমেশ এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন, "মোদী সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সমস্ত বিরোধী দল সর্বদলীয় বৈঠক থেকে কয়েক মিনিটের জন্য ওয়াকআউট করেছে। NCPI-কে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতিবাদেই এই পদক্ষেপ। এই দলটি ২০ জন তথাকথিত 'বিদ্রোহী' তৃণমূল সাংসদের জন্য একটি পার্কিং প্লেস, যখন স্পিকারের কাছে তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি।"

কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের সমালোচনা

তৃণমূল নেত্রী মহুয়া মৈত্র বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধী দলগুলো। তিনি বলেন, "আজ কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, জেএমএম, আম আদমি পার্টি, ন্যাশনাল কনফারেন্স, বাম দল, শিবসেনা (ইউবিটি) সহ সমগ্র বিরোধী শিবির সর্বদলীয় বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করেছে। কারণ তথাকথিত NCPI একটি অস্বীকৃত দল। টেবিল অফিসের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য সংখ্যা ২৮। এই ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের সংযুক্তিকরণ স্পিকার অনুমোদন করেননি।"

বিরোধীদের দাবি

এদিকে, কংগ্রেস সাংসদ প্রমোদ তিওয়ারি বলেন, সংবিধানকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতেই তারা ওয়াকআউট করেছেন। শিবসেনা (ইউবিটি) সাংসদ অরবিন্দ সাওয়ান্তও এই প্রতিবাদের সমর্থন করে তাদের দলের বিদ্রোহী সাংসদদের স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

NCPI-এর নেতা হিসেবে সর্বদলীয় বৈঠকে যোগ দেওয়া বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "হাউস বিরোধীদেরই" এবং সরকারের উচিত সংসদের মসৃণ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা। তিনি দাবি করেন, NCPI একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল।

সুদীপ ANI-কে বলেন, "সংসদ চলতে দিন। আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং দেশের ঐক্যের নীতিতে দৃঢ় বিশ্বাসী। আমরা এই লাইন থেকে সরছি না। আমরা স্বভাবগতভাবে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ। NCPI-এর সংবিধানে এই নীতিগুলোই লেখা আছে। আমরা মনে করি এটা তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যে ২০ জন সাংসদ NCPI গঠন করেছেন, তাদের মধ্যে তিনজন মুসলিম।"

লোকসভায় বিল পেশ হতে পারে

লোকসভার কার্যতালিকা অনুযায়ী, কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্ট (বিচারপতি সংখ্যা) সংশোধনী বিল, ২০২৬ পেশ করতে চলেছে। এই বিলের মাধ্যমে শীর্ষ আদালতে বিচারপতির সর্বোচ্চ সংখ্যা ৩৩ থেকে বাড়িয়ে ৩৭ করা হবে। আইন প্রতিমন্ত্রী (স্বাধীন দায়িত্ব) অর্জুন রাম মেঘওয়াল বিলটি পেশ করবেন।

আসন্ন অধিবেশনে কেন্দ্র ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬ এবং বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল, ২০২৫ লোকসভায় পেশ করতে পারে।

FCRA সংশোধনী বিল অনুযায়ী, কোনো সংস্থার FCRA সার্টিফিকেট-এর মেয়াদ শেষ হলে বা সরকার নবীকরণ না করলে তা বাতিল হয়ে যাবে। এই সংশোধনীতে বিদেশি অনুদান এবং সম্পদ পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে। কেরালার বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই বিলটি একটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে, কারণ ওই রাজ্যে বহু খ্রিস্টান সংগঠন FCRA-এর অধীনে তহবিল পায়।

বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল, যা আগে হায়ার এডুকেশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া (HECI) বিল নামে পরিচিত ছিল, সেটি ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (UGC), অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন (AICTE) এবং ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশন (NCTE)-এর পরিবর্তে আনা হচ্ছে।

এই বিলের মাধ্যমে প্রথমবার ইনস্টিটিউটস অফ ন্যাশনাল ইম্পর্টেন্স (INIs)-কে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। বিলটির ১৫(৩)(জি) ধারা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশন কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিগত নির্দেশ মানতে "বাধ্য থাকবে" এবং কোনো মতবিরোধ হলে "সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে"। যদিও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছেন, এই বিধানটি বিদ্যমান আইনি কাঠামো থেকে আলাদা নয়।

এদিকে, সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু দলগুলোর সদস্য সংখ্যা নিয়ে আলোচনার কথা উল্লেখ করে বলেন, তারা কোনো সদস্যকে তাদের অধিকার থেকে "বঞ্চিত" করতে পারেন না।

লোকসভায় সংখ্যার এই আলোচনাটি প্রাসঙ্গিক কারণ শিবসেনার ৬ জন সাংসদ এবং NCPI-এর সমর্থনে NDA জোট নিম্নকক্ষে ৩৬০ আসনের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

মহারাষ্ট্র বিবাদ লোকসভায়

লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা শিবসেনা (ইউবিটি)-র ৬ জন বিদ্রোহী সাংসদকে মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনার সঙ্গে মিশে যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন। এর ফলে শিবসেনার শক্তি বেড়ে ১৩ হয়েছে এবং ইউবিটি সেনার সদস্য সংখ্যা কমে ৩ হয়েছে।

এছাড়াও, স্পিকার তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসা ২০ জন সাংসদের জন্য লোকসভায় আলাদা আসনের অনুমোদন দিয়েছেন। তবে তৃণমূল বিদ্রোহীদের NCPI-এর সঙ্গে সংযুক্তিকরণ এখনও স্পিকার অনুমোদন করেননি।

ডিলিমিটেশন বিল পাশে কেন্দ্রের চাল!

বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (NDA)-এর লোকসভায় বর্তমানে স্পিকার সহ ২৯৮টি আসন রয়েছে। যদি স্পিকার তৃণমূল বিদ্রোহী এবং NCPI-এর সংযুক্তি অনুমোদন করেন, তাহলে NDA-এর শক্তি বেড়ে ৩১৮ হবে। ৫৪০ সদস্যের হাউসে (বর্তমানে তিনটি আসন শূন্য) NDA দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার (৩৬০) কাছাকাছি চলে আসবে।

এই সংখ্যার আলোচনার প্রেক্ষাপটে জল্পনা চলছে যে কেন্দ্র সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে। এই বিলে লোকসভার আসন সংখ্যা ৮৫০ পর্যন্ত বাড়ানো এবং নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম, ২০২৩ কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে, যার মাধ্যমে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। বিলটি এপ্রিলে ২৯৮টি ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছিল।

কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলো এই ডিলিমিটেশন বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছে।

তবে, তামিলনাড়ুতে কংগ্রেস সেকুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স ছাড়ার পর INDIA জোট ত্যাগ করা DMK এই বিষয়ে "অপেক্ষা করো এবং দেখো" নীতি নিয়েছে। DMK আগে এই বিলের বিরুদ্ধে তীব্র প্রচার চালিয়েছিল, তাদের অভিযোগ ছিল এর ফলে দক্ষিণী রাজ্যগুলোর শক্তি লোকসভায় কমে যাবে।

DMK নেতা টিকেএস এলানগোভান বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পরামর্শ রয়েছে এবং লোকসভায় দক্ষিণী রাজ্যগুলোর আসন প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়।

বিরোধীদের দাবি

এদিকে, এই বাদল অধিবেশনে বিরোধীরা অযোধ্যা রাম মন্দির অনুদান আত্মসাৎ মামলা এবং NEET-UG প্রশ্নপত্র ফাঁস সহ একাধিক বিষয় উত্থাপন করতে পারে। আম আদমি পার্টির (AAP) সাংসদ সঞ্জয় সিং ইতিমধ্যেই NEET-UG ২০২৬ প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আলোচনার জন্য রাজ্যসভায় রুল ২৬৭-এর অধীনে সাসপেনশন অফ বিজনেস নোটিশ দিয়েছেন।