হিমালয়ে বারবার ধস ও হড়পা বানের দরুন তৈরি হওয়া মহাবিপদ আটকাতে নতুন দিশা দেখাচ্ছে উপগ্রহ। উপগ্রহের পাঠানো ডেটা ব্যবহার করে পাহাড়ি ধসের আগাম পূর্বাভাস কীভাবে পাওয়া সম্ভব, তা নিয়ে নতুন আশার আলো দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
নেপাল সীমান্তে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটো বড়সড় পাহাড়ি বিপর্যয় ঘটে গেছে। এরপর থেকেই মহাকাশের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে পাহাড়ি ধসের আগাম সংকেত পাওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে জোরকদমে গবেষণা শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। গত ১১ অক্টোবর নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায় গোর্খা জেলার বুড়ি গণ্ডকী নদী অববাহিকায়। প্রবল হড়পা বানে ভেসে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। জল, কাদা ও নুড়ি-পাথরের ধাক্কায় বহু ঘরবাড়ি ও সরকারি পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, গৃহহীন হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর আগে অগাস্ট মাসের শেষের দিকে নেপাল-চীন সীমান্তের জিরোং-রাসাওয়া করিডোরে পাহাড়ের একটা বিশাল অংশ ভেঙে পড়েছিল। হাজার হাজার টন পাথর, বরফ ও কাদা নিচে নেমে এসেছিল সেবার।
বিজ্ঞানীরা অগাস্টের ওই বিপর্যয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে এক দারুণ বিষয় লক্ষ্য করেন। তাঁরা দেখেন, পাহাড় ধসে পড়ার আগেই সেই ঢালে যে সামান্য নড়াচড়া হচ্ছিল, স্যাটেলাইটের ডেটাতে তা আগেই ধরা পড়েছিল। এই তথ্য সামনে আসার পরই পুরো হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে স্যাটেলাইটভিত্তিক আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ নতুন গতি পেয়েছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের পিছু হটা এবং ভূকম্পনজনিত অস্থিরতার কারণে পুরো হিমালয়জুড়েই বিপদের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে।
রাডার স্যাটেলাইটের ডেটা খতিয়ে দেখে গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, ধস নামার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই পাহাড়ের গায়ে ফাটল তৈরি হওয়া কিংবা মাটি সরে যাওয়ার মতো স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। অর্থাৎ পাহাড় ধসে পড়ার আগেই সেখান থেকে সংকেত পাওয়া যাচ্ছিল।
এই স্যাটেলাইটগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ঘন মেঘ বা অন্ধকার থাকলেও মহাকাশ থেকে এরা পৃথিবীর ছবি তুলে পাঠাতে পারে। হিমালয়ের মতো এলাকায় যেখানে বর্ষাকালে টানা মেঘের কারণে সাধারণ ক্যামেরায় কিছু দেখা যায় না, সেখানে এই রাডার প্রযুক্তি অসামান্য কাজ করে। বিজ্ঞানীরা মূলত সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার ইন্টারফেরোমেট্রি পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এই ব্যবস্থায় আলাদা আলাদা সময়ে তোলা রাডার ছবি মিলিয়ে দেখা হয়। খালি চোখে যা ধরা পড়ে না, ভূপ্রকৃতির তেমন সূক্ষ্ম নড়াচড়াও এই প্রযুক্তিতে স্পষ্ট বোঝা যায়।
হিমালয়ের দূরবর্তী এবং দুর্গম পাহাড়ে যেখানে মানুষের পক্ষে গিয়ে নিয়মিত নজরদারি করা অসম্ভব, সেখানে এই প্রযুক্তি নজরদারির কাজ সহজ করে দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা একটা বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন। পাহাড়ের ঢাল সরছে বা নড়ছে তা বোঝা আর ঠিক কোন মুহূর্তে ধস নামবে তা নির্ভুলভাবে বলা, দুটো কিন্তু এক জিনিস নয়।
প্রযুক্তির অগ্রগতি হলেও পূর্বাভাসের নিখুঁত ক্ষমতায় এখনও চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আরও নিশ্চিত হয়েছেন যে, হিমালয়ে বড়সড় পাহাড় ধসের আগে কিছুটা হলেও আগাম তথ্য পাওয়া যায়। এর আগে হিমালয় অঞ্চলে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু বিপর্যয়েও দেখা গেছে, ধস নামার আগে ধীরে ধীরে পাহাড়ের গঠন দুর্বল হচ্ছিল। তবে সেই তথ্য দেখে একেবারে সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাস তৈরি করা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও বেশ কঠিন কাজ।
পাহাড় কতটা স্থির থাকবে তা নির্ভর করে ভূগঠন, হিমবাহ গলে যাওয়া, বৃষ্টির ধরণ, পারমাফ্রস্ট বা জমাট বরফ গলে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদী তাপমাত্রা পরিবর্তনের ওপর। এই সবকটি উপাদান একসঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। নেপালের অগাস্ট বিপর্যয়ে বরফ গলে যাওয়া সরাসরি কারণ ছিল কি না, গবেষকরা তার চূড়ান্ত প্রমাণ পাননি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহ পিছিয়ে গেলে আগে জমে থাকা বরফ সরে যায় এবং উন্মুক্ত পাথর ও মাটি বাইরের আবহাওয়ার সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে আলগা হতে থাকে।
আরেকটা বড় ভাবনার বিষয় হলো, পাহাড়ের কোন ছোট ধস নিচে নামতে নামতে কী রূপ নেবে। পাহাড়ের ওপরের সামান্য পাথর বা বরফ খসে পড়তে শুরু করলে তা নিচে নামার সময় পথের বালি-পাথর নিজের সঙ্গে টেনে আনে। দেখতে দেখতে তা দানবীয় কাদা-পাথরের স্রোত বা হড়পা বানে রূপ নিয়ে বহুদূর পর্যন্ত ধ্বংসলীলা চালাতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, শুধু স্যাটেলাইটের ওপর ভরসা করে বিপদ পুরোপুরি এড়ানো যাবে না। মহাকাশ থেকে নজরদারির পাশাপাশি ভূমিতে বসানো সেন্সর, নদীর পানির লেভেল মাপার যন্ত্র, আবহাওয়া স্টেশন, ভূমিকম্প মাপার যন্ত্র, ক্যামেরা এবং দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা একসঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় স্তরে সতর্কতামূলক নেটওয়ার্ক, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র এবং বিপদের সময় এলাকা খালি করার স্পষ্ট নিয়ম থাকতে হবে।
হিমালয় অঞ্চলে সীমান্তবর্তী আন্তর্জাতিক নদীর প্রবাহ বেশি থাকায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান করাও খুব দরকার। কারণ এক দেশের পাহাড়ে তৈরি হওয়া বিপদ মুহূর্তের মধ্যে অন্য দেশের নদী অববাহিকায় প্রভাব ফেলে। গবেষকদের বক্তব্য পরিষ্কার—কোন পাহাড়ে বিপদ লুকিয়ে আছে তা চিহ্নিত করতে উপগ্রহ সাহায্য করতে পারে। তবে উপগ্রহে নড়াচড়া ধরা না পড়লেই যে এলাকা নিরাপদ, কিংবা সামান্য নড়াচড়া মানেই এখনই পাহাড় ধসে পড়বে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।






