সোশ্যাল মিডিয়ায় আদালতের কার্যক্রমের রেকর্ডিংয়ের অনিয়ন্ত্রিত প্রচারকে "বোতল থেকে বেরিয়ে আসা দৈত্যের" (demon out of the bag) সঙ্গে তুলনা করল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, পূর্বানুমতি ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় আদালতের কার্যক্রমের অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং পোস্ট বা আপলোড করা নিষিদ্ধ করছে তারা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আদালতের কার্যক্রমের রেকর্ডিংয়ের অনিয়ন্ত্রিত প্রচারকে "বোতল থেকে বেরিয়ে আসা দৈত্যের" (demon out of the bag) সঙ্গে তুলনা করল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, পূর্বানুমতি ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় আদালতের কার্যক্রমের অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং পোস্ট বা আপলোড করা নিষিদ্ধ করছে তারা। আদালতের কার্যক্রমের লাইভ-স্ট্রিমিং এবং ভিডিও প্রচার বন্ধের দাবিতে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার (PIL) প্রেক্ষিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, "সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বা সুপ্রিম কোর্টের সেক্রেটারি জেনারেলের পূর্বানুমতি ছাড়া বিচারিক কার্যক্রমের অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংগ্রহ, পরিবর্তন, প্রচার, পোস্ট, রি-পোস্ট, আপলোড বা মনিটাইজেশন (monetisation) করা যাবে না।" সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে যে, এই আদেশের ফলে আদালতের কার্যক্রমের খবর পরিবেশনের উপর কোনও প্রভাব পড়বে না এবং এটিকে কোনওভাবেই বাক-স্বাধীনতা খর্ব করার আদেশ (gag order) হিসেবে দেখা উচিত নয়।
একজন সাংবাদিকের দায়ের করা আবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, আদালতের কার্যক্রমের নির্বাচিত অংশ এবং প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে (decontextualised) বিভিন্ন কথোপকথন প্রচার করার ফলে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং বিচার ব্যবস্থার উপর জনগণের আস্থা কমে যাচ্ছে। বিচারপতি বাগচী বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, "আমরা মূলত ভিডিও রেকর্ডিং এবং সেই ভিডিও আপলোড করাটাই বন্ধ করছি। আমরা এও বলেছি যে, যদি কোনও লাইভ-স্ট্রিমিং বা অডিও-ভিজুয়াল দেখানো হয়, তবে তা অবশ্যই হাইকোর্টের সেক্রেটারি জেনারেল এবং রেজিস্ট্রার জেনারেলের অনুমতি সাপেক্ষে হতে হবে।"
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা উল্লেখ করেন যে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম এমন সব ক্লিপে ভরে আছে যেখানে আইনজীবীরা তাঁদের যুক্তিতর্ক তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এর জবাবে বিচারপতি বাগচী বলেন, "বোতল থেকে বেরিয়ে আসা কোনও দৈত্যকে আমরা আর আটকাতে পারি না।" আদালত যে ২৪ ঘণ্টা বিনোদনমূলক চ্যানেল হতে পারে না—তা উল্লেখ করে বিচারপতি বাগচী বলেন, "আমাদের সীমিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাই লাইভ-স্ট্রিমিং ব্যবস্থা সীমিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে স্পষ্টভাবে আবেদন করতে হবে। এটি ২৪ ঘণ্টা বিনোদনমূলক চ্যানেল হতে পারে না।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভার্চুয়াল শুনানির জন্য দেওয়া অনলাইন অ্যাক্সেস লিঙ্কগুলো প্রায়শই নির্বিচারে শেয়ার করা হয় এবং এ ধরনের প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আদালতের ভিডিও প্রচারের বিষয়ে মেটা (Meta), এক্স (X) এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছেও নোটিশ জারি করেছে আদালত। বিচারপতি ভি মোহনাও স্পষ্ট করেছেন যে, এটি বাক-স্বাধীনতা খর্ব করার কোনও আদেশ নয়। আবেদনকারীর পক্ষে উপস্থিত প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিং আদালতের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের (লাইভস্ট্রিমিং) বিষয়টি সমর্থন করলেও, তিনি কয়েক দিন আগের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। ওই ঘটনায় এক আবেদনকারী বিচারকদের বেঞ্চের দিকে কাগজপত্র ছুড়ে মারেন এবং প্রধান বিচারপতিকে (CJI) গালিগালাজ করেন। ঘটনাটির ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। তিনি বলেন, "বিষয়টি এখন তামাশায় পরিণত হয়েছে।"
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাও সিং এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর অপব্যবহারের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, "এআই টুল ব্যবহার করে বিচারক বা আইনজীবীদের কথা বিকৃত করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।" প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তও জানান যে কীভাবে তাঁর বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, "প্রিন্ট মিডিয়ায় আমি ইতিমধ্যেই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। আমি যা কখনও বলিনি, তা-ই আমার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।"
২০ জুলাই পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে করা একটি আবেদনের জরুরি শুনানির অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরকে প্রধান বিচারপতি দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, সেটি ছিল কেবলই একটি 'রিপ্রেজেন্টেশন' বা আবেদনপত্র (স্মারকলিপি), কোনও আনুষ্ঠানিক আইনি পিটিশন বা মামলা নয়। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এ বিষয়ে কোনও পিটিশন বা মামলা দায়ের করা হয়নি।
তিনি বলেন, "গত দু'দিনে সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি দাবি করা হয়েছে যে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অথচ কোনও দায়বদ্ধতা ছাড়াই সংবাদমাধ্যম ভুল খবর প্রচার করছে যে প্রধান বিচারপতি বিষয়টি তালিকাভুক্ত করতে অস্বীকার করেছেন।"
শুক্রবার জরুরি শুনানির জন্য আইনজীবীরা যখন তাঁদের মামলার প্রসঙ্গ উত্থাপন করছিলেন, তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, "সকাল ১০টা পর্যন্ত একটি পাতাও জমা পড়েনি। এটি ছিল কেবল একটি আবেদনপত্র... যা মিশ্র বা অন্য কেউ পাঠিয়েছিলেন। আমি কীভাবে সেই আবেদনপত্রকে একটি রিট পিটিশন হিসেবে গণ্য করতে পারি? অথচ মানুষজন দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে এ নিয়ে খবর প্রচার করতে শুরু করেছে।"
