CBSE-র ত্রিভাষা নীতি নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এই নীতি চালু হওয়ার কথা। তার আগে এই নীতির কয়েকটি দিক নিয়ে কেন্দ্র, NCERT এবং CBSE-কে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে বলেছে আদালত।

ইংরেজিকে 'অ-স্থানীয়' ভাষা বলা হচ্ছে কেন?

প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। CBSE-র জারি করা সার্কুলারকে চ্যালেঞ্জ করে যে পিটিশনগুলি জমা পড়েছিল, তা খতিয়ে দেখে আদালত। শুনানির সময় বিচারপতি বাগচী প্রশ্ন তোলেন, ইংরেজিকে 'নন-নেটিভ' বা 'অ-স্থানীয় ভাষা' বলার ভিত্তিটা ঠিক কী? তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশের অনেক রাজ্যেই ইংরেজি সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এমনকি কেন্দ্র সরকার এবং আদালতের কাজও মূলত ইংরেজিতেই চলে।

বিচারপতি বাগচী বলেন, "'নেটিভ' শব্দটা নিয়েই আমার আপত্তি আছে।" তাঁর মতে, এই শব্দের সঙ্গে ঔপনিবেশিকতার ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এর বদলে 'ইন্ডিজেনাস' বা দেশীয় ভাষা শব্দটি ব্যবহার করা যায় কি না, তা ভেবে দেখার পরামর্শ দেন তিনি। বেঞ্চের মতে, দেশের সাংবিধানিক কাঠামো, ইতিহাস এবং সরকারি স্তরে ইংরেজির ব্যবহার—এই সব দিক মাথায় রেখেই এর ভূমিকা বিচার করা উচিত।

ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়াদের কি ছাড় দেওয়া যায়?

ত্রিভাষা নীতি কোন শ্রেণি থেকে চালু করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত। বেঞ্চ জানতে চায়, যে সব পড়ুয়ারা এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে, তাদের ওপর এখনই নতুন নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায় কি না। CBSE-র তালিকায় ২৩টি ভাষা থাকলেও প্রত্যেক স্কুলে সেই ভাষাগুলি পড়ানোর মতো পরিস্থিতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলেছে আদালত। পড়ুয়ারা ইতিমধ্যেই একটি ভাষা বেছে নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে পড়ছে। হঠাৎ করে এই পরিবর্তনে তাদের সমস্যা হতে পারে। তাই এই শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়াদের কিছুটা সময় দিয়ে পরের বছর থেকে নীতিটি চালু করার কথা ভেবে দেখতে বলা হয়েছে। নতুন ভাষা বেছে নেওয়ার আগে পড়ুয়ারা যাতে সব তথ্য পায়, তার জন্য কেন্দ্রকে স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরির কথাও বলেছে আদালত।

২৩টি ভাষার জন্য যথেষ্ট শিক্ষক ও বই আছে তো?

CBSE যে ২৩টি ভাষার তালিকা দিয়েছে, সেগুলি সব স্কুলে পড়ানোর মতো পরিকাঠামো আছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছে আদালত। বেঞ্চ জানতে চেয়েছে, এই ভাষাগুলি পড়ানোর জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক কতজন আছেন? প্রয়োজনীয় পাঠ্যবই বা অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রী কি আদৌ পাওয়া যাচ্ছে? কতগুলো CBSE স্কুল সত্যি সত্যি এই ভাষাগুলো পড়ানোর অবস্থায় আছে? এই সব তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, নীতি চালু করাটা ভুল নয়, কিন্তু তা ঠিকভাবে কার্যকর করতে গেলে যে সমস্যাগুলো আসবে, সেগুলোকে আগে থেকে চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। এর জন্য কেন্দ্র, CBSE এবং বিশেষজ্ঞদের একসঙ্গে বসে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

হঠাৎ ভাষা বদলালে পড়ুয়াদের উপর চাপ বাড়বে না?

আবেদনকারীদের পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন আদালতকে জানান, এই নীতির ফলে পড়ুয়ারা যে ভাষা বেশ কয়েক বছর ধরে পড়ছে, তা মাঝপথে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। তিনি যুক্তি দেন, অনেক স্কুলেই নতুন ভাষা পড়ানোর জন্য শিক্ষক, বই বা ক্লাসরুম এখনও তৈরি নয়। আবেদনকারীদের আইনজীবীদের দাবি, এই নীতির ফলে প্রায় ৩০ লক্ষ পড়ুয়া প্রভাবিত হতে পারে। যদিও কেন্দ্রের তরফে অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি এই যুক্তির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং এই নীতি কার্যকর করার বিষয়ে তথ্য দিতে প্রস্তুত।

২০২৬-২৭ থেকেই চালু করার আগে ফের ভাবুন: সুপ্রিম কোর্ট

আবেদনকারীরা CBSE-র ১৫ মে, ২০২৬-এর একটি সার্কুলারকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন। সেই সার্কুলারে বলা হয়েছিল, ১ জুলাই, ২০২৬ থেকে নবম শ্রেণির পড়ুয়াদের তিনটি ভাষা পড়তে হবে, যার মধ্যে অন্তত দুটি ভারতীয় ভাষা হতে হবে। এর আগে এই নীতিতে স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত তখন মৌখিকভাবে মন্তব্য করে, "ভাষা শেখা কখনও বৃথা যায় না।" তবে আবেদনকারীদের যুক্তি, নতুন নীতির কারণে পড়ুয়াদের পঞ্চম শ্রেণি থেকে পড়া একটি ভাষা ছেড়ে দিতে হবে।

অন্যদিকে, বিচারপতি বি.ভি. নাগারত্ন এর আগে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, নবম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষা চালু করলে বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় পড়ুয়াদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। আপাতত সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র, NCERT এবং CBSE-কে তাদের নীতি পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষক, পাঠ্যবই, পড়ুয়াদের পছন্দের সুযোগ এবং নীতি চালুর সময়—এই সব বিষয় মাথায় রেখে একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছে।